সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.৩৩ — অনিত্য ও অসুখময় জগতে ভক্তি, মানবজীবনের উদ্দেশ্য ও ঈশ্বরলাভ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
কিং পুনর্ব্রাহ্মণাঃ পুণ্যা ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা।অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য ভজস্ব মাম্।।৩৩।।
কিং পুনর্ব্রাহ্মণাঃ পুণ্যা ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা।
অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য ভজস্ব মাম্।।৩৩।।

অনুবাদঃ পুণ্যবান ব্রাহ্মণ, ভক্ত ও রাজর্ষিদের আর কি কথা? তাঁরা আমাকে আশ্রয় করলে নিশ্চয়ই পরাগতি লাভ করবেন। অতএব, তুমি এই অনিত্য দুঃখময় মর্ত্যলোক লাভ করে আমাকে ভজনা কর।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের তেত্রিশতম শ্লোকটি মানুষের জীবন, জগতের প্রকৃতি এবং ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশ করে। শ্লোকটি হলো “কিং পুনর্ব্রাহ্মণাঃ পুণ্যা ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা। অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য ভজস্ব মাম্।” এর সহজ অর্থ হলো, পুণ্যবান ব্রাহ্মণ, ভক্ত এবং রাজর্ষিদের কথা তো বলাই বাহুল্য। অতএব এই অনিত্য ও অসুখময় জগতে এসে আমার ভজনা কর। কিন্তু এই অনুবাদ কেবল শ্লোকটির বাহ্যিক অর্থ প্রকাশ করে। এর অন্তরে রয়েছে মানুষের অস্তিত্ব, অনিত্যতা, নৈতিকতা, ভক্তি এবং জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর এক দার্শনিক আহ্বান।

শ্লোকটির শুরুতেই এসেছে “কিং পুনঃ”। সংস্কৃত “কিম্” শব্দের অর্থ কী এবং “পুনঃ” শব্দের অর্থ আবার, আরও বা পুনরায়। কিন্তু এখানে এটি সরাসরি প্রশ্ন নয়। এটি একটি অলঙ্কারিক প্রকাশ। এর ভাব হলো, যদি সাধারণভাবে যাদের সমাজের দৃষ্টিতে পিছিয়ে থাকা মানুষ মনে করা হয় তারাও ঈশ্বরের আশ্রয় নিয়ে পরমগতি লাভ করতে পারে, তাহলে পুণ্যবান, জ্ঞানী, ভক্ত এবং রাজর্ষিদের কথা তো আরও সহজেই বলা যায়। এই একটি অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে কৃষ্ণ মানুষের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনাকে সামাজিক পরিচয়ের সংকীর্ণতার বাইরে নিয়ে গেছেন।

“ব্রাহ্মণ” শব্দটির সঙ্গে “ব্রহ্ম” শব্দের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। “ব্রহ্ম” শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত বৃহ্ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে, যার মধ্যে বৃদ্ধি, বিস্তার এবং বৃহত্ত্বের ধারণা নিহিত। সেই দৃষ্টিতে ব্রাহ্মণ শব্দের গভীরে রয়েছে ব্রহ্মসন্ধান, জ্ঞানচর্চা এবং সত্যের অনুসন্ধানের ভাব। ঐতিহাসিক ও সামাজিক ব্যবহারে ব্রাহ্মণ একটি নির্দিষ্ট বর্ণপরিচয় বহন করলেও গীতার আধ্যাত্মিক পরিসরে জ্ঞান, সাধনা, চরিত্র এবং ব্রহ্মজিজ্ঞাসার গুরুত্ব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাই এই শব্দকে শুধু জন্মগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে এর বৃহত্তর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যায়।

এরপর এসেছে “পুণ্য” শব্দটি। পুণ্য বলতে সাধারণত শুভ, পবিত্র, কল্যাণকর এবং ধর্মসম্মত কর্মের ফলকে বোঝায়। কিন্তু পুণ্যের গভীর অর্থ কেবল কোনো বাহ্যিক পুরস্কার পাওয়া নয়। মানুষের যে চিন্তা, আচরণ এবং কর্ম তার চেতনাকে শুদ্ধ করে, অন্যের কল্যাণে উদ্বুদ্ধ করে এবং সত্যের দিকে নিয়ে যায়, তার মধ্যেই পুণ্যের প্রকৃত তাৎপর্য রয়েছে। সত্যবাদিতা, দয়া, আত্মসংযম, দান, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং অন্যের কল্যাণের প্রতি আন্তরিকতা মানুষের অন্তরকে এমনভাবে প্রস্তুত করে, যাতে সে জীবনের গভীরতর সত্য উপলব্ধি করতে পারে।

“ভক্তা” শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ। ভক্ত শব্দটি সংস্কৃত ভজ্ ধাতু থেকে এসেছে। এই ধাতুর মধ্যে ভাগ নেওয়া, গ্রহণ করা, সেবা করা, উপাসনা করা এবং নিবেদিত হওয়ার অর্থ রয়েছে। তাই ভক্তি কেবল আবেগের বিষয় নয়। ভক্তি হলো ঈশ্বরের সঙ্গে একটি জীবন্ত সম্পর্ক স্থাপন করা। একজন ভক্ত শুধু ঈশ্বরের কাছে কিছু চায় না। সে নিজের জীবন, কর্ম, চিন্তা এবং অনুভূতিকেও ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখে। এই অর্থে ভক্তি মানুষের অহংকেন্দ্রিক জীবনকে ঈশ্বরকেন্দ্রিক জীবনে রূপান্তর করার একটি পথ।

“রাজর্ষি” শব্দটির মধ্যেও ভারতীয় দর্শনের একটি অসাধারণ আদর্শ প্রকাশ পেয়েছে। রাজর্ষি শব্দটি রাজা এবং ঋষি এই দুটি ধারণার সমন্বয়। রাজা নির্দেশ করে ক্ষমতা, প্রশাসন, নেতৃত্ব এবং সামাজিক দায়িত্বকে। ঋষি নির্দেশ করে জ্ঞান, আত্মসংযম, সত্যদর্শন এবং আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞাকে। ফলে রাজর্ষি হলেন এমন একজন শাসক যার হাতে ক্ষমতা থাকলেও তার অন্তর ক্ষমতার দ্বারা পরিচালিত হয় না। তিনি জ্ঞান ও নৈতিকতার দ্বারা ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। এই ধারণা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ক্ষমতার সঙ্গে যদি নৈতিকতা ও আত্মসংযম না থাকে, তাহলে ক্ষমতা সহজেই মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে মানুষের ওপর আধিপত্যের উপায় হয়ে উঠতে পারে।

এরপর শ্লোকটি হঠাৎ মানুষের দৃষ্টি নিয়ে যায় জগতের প্রকৃতির দিকে। কৃষ্ণ বলেন “অনিত্যমসুখং লোকম্”। “অনিত্য” শব্দটি গঠিত হয়েছে “অ” এবং “নিত্য” থেকে। নিত্য অর্থ স্থায়ী, চিরন্তন এবং অবিচল। তার বিপরীত হলো অনিত্য। অর্থাৎ যা পরিবর্তনশীল, ক্ষণস্থায়ী এবং চিরকাল একই অবস্থায় থাকে না। মানুষের দেহ পরিবর্তিত হয়। সম্পর্কের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। সম্পদ আসে এবং চলে যায়। ক্ষমতা আসে এবং বিলীন হয়। খ্যাতি তৈরি হয় এবং একসময় বিস্মৃত হয়। এই পরিবর্তনশীলতাই জগতের অনিত্যতার প্রকাশ।

“অসুখ” শব্দটিও অত্যন্ত গভীর। এর অর্থ সুখহীন বা দুঃখময়। কিন্তু এখানে কৃষ্ণ পৃথিবীতে কোনো সুখ নেই এমন কথা বলছেন না। পৃথিবীতে আনন্দ আছে, সৌন্দর্য আছে, ভালোবাসা আছে, সাফল্য আছে এবং অসংখ্য মূল্যবান অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু এসবের কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। ফলে এই জগতকে যদি মানুষ তার পরম ও স্থায়ী সুখের একমাত্র আশ্রয় মনে করে, তাহলে একসময় তাকে হতাশ হতে হবে। কারণ যে বস্তু নিজেই পরিবর্তনশীল, তার ওপর স্থায়ী সুখের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব নয়। “অসুখ” তাই পৃথিবীর সম্পূর্ণ অস্বীকার নয়। বরং এটি পৃথিবীর সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি।

“লোক” শব্দটি এখানে শুধু ভৌগোলিক পৃথিবী বোঝায় না। এটি মানুষের অভিজ্ঞতার জগতকে বোঝায়। জন্ম, মৃত্যু, সম্পর্ক, কর্ম, আকাঙ্ক্ষা, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ এবং বেদনা মিলিয়ে যে জীবনজগৎ তৈরি হয়, সেটিই এখানে লোক। আর “ইমম্” অর্থ এই। কৃষ্ণ কোনো দূরবর্তী কাল্পনিক জগতের কথা বলছেন না। তিনি মানুষের সামনে তার বর্তমান জীবনকেই দেখাচ্ছেন। এই জীবনই অনিত্য। এই জীবনই পরিবর্তনশীল। এই জীবনেই মানুষকে তার চূড়ান্ত সত্যের সন্ধান করতে হবে।

“প্রাপ্য” শব্দটি এসেছে প্রাপ্তি বা লাভ করার ধারণা থেকে। অর্থাৎ এই জগৎ লাভ করে, এই মানবজীবন পেয়ে বা এই জগতে এসে। এখানে মানবজন্মের মূল্যও নিহিত আছে। জীবন অনিত্য বলেই তা অর্থহীন নয়। বরং অনিত্য বলেই জীবনকে সচেতনভাবে ব্যবহার করার প্রয়োজন আরও বেশি। মানুষ জানে তার সময় সীমিত। তাই সেই সীমিত সময়কে কেবল ভোগ, অহংকার, প্রতিযোগিতা এবং বাহ্যিক সাফল্যের পেছনে ব্যয় না করে জীবনের গভীরতর উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করা উচিত।

এই কারণেই শ্লোকের শেষ নির্দেশটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। “ভজস্ব মাম্” অর্থ আমাকে ভজনা করো, আমার আশ্রয় গ্রহণ করো, আমাকে উপাসনা করো এবং আমার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করো। “ভজস্ব” শব্দটি ভজ্ ধাতু থেকে এসেছে। এখানে এটি আদেশাত্মক রূপ। কিন্তু কৃষ্ণের এই নির্দেশকে কেবল বাহ্যিক পূজা বা ধর্মীয় আচার হিসেবে বোঝা যথেষ্ট নয়। এর গভীর অর্থ হলো জীবনের কেন্দ্রকে পরিবর্তন করা। মানুষ সাধারণত অর্থ, ক্ষমতা, খ্যাতি, সম্পর্ক অথবা নিজের পরিচয়কে জীবনের কেন্দ্র বানায়। কৃষ্ণ বলছেন, এই পরিবর্তনশীল জগতের কোনো অনিত্য বস্তুকে জীবনের চূড়ান্ত কেন্দ্র বানিও না। পরম সত্যকে কেন্দ্র করে জীবনকে অর্থপূর্ণ করো।

এই শ্লোকের দর্শনকে একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। একটি ফুল সকালে ফুটল। তার সৌন্দর্য আমাদের আনন্দ দেয়। কিন্তু আমরা জানি ফুলটি চিরকাল থাকবে না। ফুলের অনিত্যতা তার সৌন্দর্যকে অর্থহীন করে না। বরং তার ক্ষণস্থায়িত্ব আমাদের তার সৌন্দর্যকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শেখায়। মানুষের জীবনও তেমন। জীবন সীমিত বলেই প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। কিন্তু সেই সীমিত জীবনের মধ্যে যদি মানুষ এমন কিছুকে চূড়ান্ত সত্য মনে করে যা নিজেই পরিবর্তনশীল, তাহলে তার মধ্যে অস্থিরতা জন্ম নেবে। গীতা সেই অস্থিরতার মধ্যেই নিত্য সত্যের সন্ধান করতে বলে।

এই কারণে “অনিত্যমসুখং লোকম্” কোনো নৈরাশ্যের দর্শন নয়। এটি জগতকে ঘৃণা করার শিক্ষা নয়। এটি জীবন থেকে পালানোর আহ্বানও নয়। বরং এটি বাস্তবতাকে সঠিকভাবে দেখার শিক্ষা। পৃথিবীতে থেকেও পৃথিবীর অনিত্য প্রকৃতি বুঝতে হবে। কর্ম করতে হবে, সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে, সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং জীবনের সৌন্দর্য অনুভব করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে বুঝতে হবে যে এগুলোর কোনোটিই চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী আশ্রয় নয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গীতার কর্মযোগেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ তার কর্তব্য পালন করবে, কিন্তু কর্মের পরিবর্তনশীল ফলকে নিজের অস্তিত্বের চূড়ান্ত ভিত্তি বানাবে না। সে সম্পদ ব্যবহার করবে, কিন্তু সম্পদকে নিজের পরিচয় বানাবে না। সে ক্ষমতা ব্যবহার করবে, কিন্তু ক্ষমতাকে নিজের অহংকারের ভিত্তি বানাবে না। সে সম্পর্ককে ভালোবাসবে, কিন্তু অনিত্যতার সত্য ভুলে যাবে না। এই ভারসাম্যই গীতার জীবনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

শ্লোকটির আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক অর্থও অত্যন্ত গভীর। মানুষ নিরাপত্তা খোঁজে। কেউ অর্থে নিরাপত্তা খোঁজে। কেউ সামাজিক মর্যাদায়। কেউ সম্পর্কের মধ্যে। কেউ নিজের সাফল্যের মধ্যে। কিন্তু বাহ্যিক জগত পরিবর্তনশীল হওয়ায় এসবের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা মানুষের ভেতরে ভয় ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। গীতার শিক্ষা হলো এমন একটি অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র তৈরি করা যা বাহ্যিক পরিবর্তনের মধ্যেও স্থির থাকতে পারে। ভক্তি সেই অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র নির্মাণের একটি শক্তিশালী পথ।

“রাজর্ষি” ধারণাটিও এই প্রসঙ্গে নতুন অর্থ পায়। একজন মানুষের হাতে যত বেশি ক্ষমতা থাকবে, তার অন্তরে তত বেশি আত্মসংযমের প্রয়োজন। জ্ঞানহীন ক্ষমতা বিপজ্জনক হতে পারে। নৈতিকতাহীন নেতৃত্ব সমাজকে বিভ্রান্ত করতে পারে। তাই রাজর্ষির আদর্শ বলে, নেতৃত্বের সঙ্গে প্রজ্ঞা থাকতে হবে এবং ক্ষমতার সঙ্গে নৈতিকতা থাকতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজেও এই শিক্ষা গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।

শ্লোকটির সাহিত্যিক সৌন্দর্যও লক্ষণীয়। প্রথমে এসেছে ব্রাহ্মণ, পুণ্যবান, ভক্ত এবং রাজর্ষির মতো মানুষের কথা। এরপর এসেছে অনিত্য ও অসুখময় জগতের কথা। সবশেষে এসেছে “ভজস্ব মাম্”। অর্থাৎ শ্লোকটি মানুষের আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা থেকে শুরু করে জগতের সীমাবদ্ধতার দিকে যায় এবং সেখান থেকে ঈশ্বরাশ্রয়ের দিকে ফিরে আসে। এই গঠন শ্লোকটিকে শুধু একটি ধর্মীয় বাক্য নয়, একটি সম্পূর্ণ জীবনদর্শনে পরিণত করেছে।

এই শ্লোককে যদি আরও গভীরভাবে পড়া হয়, তাহলে এর মধ্যে মানুষের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখা আছে। মানুষ যদি জানে যে তার জীবন সীমিত, তাহলে সে এই সীমিত জীবন দিয়ে কী করবে। কৃষ্ণের উত্তর হলো পরম সত্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা। এই সম্পর্কই ভক্তির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তাই ভক্তি শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়। এটি মানুষের অস্তিত্বের কেন্দ্রকে পুনর্নির্ধারণ করার একটি প্রক্রিয়া।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.৩৩ শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর সত্যের সামনে দাঁড় করায়। আমরা এমন এক জগতে বাস করি যা পরিবর্তনশীল। আমরা এমন দেহে বাস করি যা ক্ষয়শীল। আমরা এমন সম্পর্ক ও পরিস্থিতির মধ্যে বাস করি যা সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। কিন্তু এই পরিবর্তনশীলতার মধ্যেই মানুষ এমন এক সত্যের সন্ধান করতে পারে যা তার কাছে নিত্য বলে প্রতিভাত হয়। সেই অনুসন্ধানই আধ্যাত্মিকতার সূচনা।

তাই এই শ্লোকের প্রকৃত আহ্বান পৃথিবীকে ত্যাগ করা নয়। বরং পৃথিবীর প্রকৃতি বুঝে জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা। অনিত্যকে অনিত্য হিসেবে দেখা এবং নিত্য সত্যের দিকে মন ফেরানো। নিজের কর্মকে অর্থপূর্ণ করা। নিজের অহংকারকে ছোট করা। জ্ঞানকে গভীর করা। ভক্তিকে জীবন্ত করা। আর জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পরম সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া।

সবশেষে বলা যায়, “কিং পুনর্ব্রাহ্মণাঃ পুণ্যা ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা” মানুষের আধ্যাত্মিক যোগ্যতার কথা বলে, “অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য” জীবনের অনিত্যতা ও সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং “ভজস্ব মাম্” সেই অনিত্যতার মধ্যেই নিত্য আশ্রয়ের সন্ধান দেয়। এই তিনটি স্তর মিলিয়েই শ্লোকটির পূর্ণ দর্শন গড়ে ওঠে। মানুষ জগতের মধ্যে থাকবে, কিন্তু জগতের পরিবর্তনশীলতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলবে না। সে জীবনকে ভালোবাসবে, কিন্তু অনিত্যকে চিরন্তন মনে করবে না। সে কর্তব্য পালন করবে, কিন্তু অহংকারকে নিজের কেন্দ্র বানাবে না। আর শেষ পর্যন্ত তার চেতনা ফিরে যাবে সেই পরম সত্যের দিকে, যাকে কৃষ্ণ নিজের মধ্যে উপলব্ধি করতে আহ্বান করেছেন। এই কারণেই গীতা ৯.৩৩ শুধু একটি শ্লোক নয়, বরং অনিত্য জীবনের মধ্যে নিত্য সত্যের সন্ধানের এক গভীর আধ্যাত্মিক আহ্বান।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি