শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.৩৪ — মন, ভক্তি, কর্ম, আত্মসমর্পণ ও ঈশ্বরলাভের পূর্ণাঙ্গ পথ
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি যুক্ত্বৈবমাত্মানং মৎপরায়ণঃ।।৩৪।।
অনুবাদঃ তোমার মনকে আমার ভাবনায় নিযুক্ত কর, আমার ভক্ত হও, আমাকে প্রণাম কর এবং আমার পূজা কর। এভাবেই মৎপরায়ণ হয়ে সম্পূর্ণরূপে আমাতে অভিনিবিষ্ট হলে, নিঃসন্দেহে তুমি আমাকে লাভ করবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের চৌত্রিশতম শ্লোকটি এমন একটি শ্লোক যেখানে শ্রীকৃষ্ণ অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ভাষায় মানুষের সমগ্র আধ্যাত্মিক জীবনকে একটি পূর্ণাঙ্গ পথে স্থাপন করেছেন। শ্লোকটি হলো
এই শ্লোকের সরল অর্থ হলো, তোমার মন আমার মধ্যে স্থাপন করো, আমার ভক্ত হও, আমাকে উদ্দেশ্য করে যজ্ঞ ও কর্ম সম্পাদন করো এবং আমাকে প্রণাম করো। এইভাবে নিজের সমগ্র সত্তাকে আমার সঙ্গে যুক্ত করে আমাকে জীবনের পরম লক্ষ্য করলে তুমি আমাকেই লাভ করবে। কিন্তু এই সরল অর্থের অন্তরে রয়েছে মানুষের মন, হৃদয়, কর্ম, অহংকার এবং জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য সম্পর্কে এক গভীর দর্শন।
এই শ্লোকের প্রথম শব্দ মন্মনা। শব্দটি মৎ এবং মনস্ ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। মৎ অর্থ আমার এবং মনস্ অর্থ মন বা চিত্ত। তাই মন্মনা অর্থ যার মন আমার মধ্যে নিবিষ্ট। এখানে কৃষ্ণ কেবল মাঝে মাঝে তাঁকে স্মরণ করতে বলছেন না। তিনি মানুষের চিন্তার কেন্দ্র পরিবর্তন করতে বলছেন। মানুষ যে বিষয়কে বারবার চিন্তা করে, তার জীবন ধীরে ধীরে সেই বিষয়ের চারপাশে গড়ে ওঠে। অর্থ, ক্ষমতা, সম্মান, ভয়, আকাঙ্ক্ষা কিংবা সাফল্য যখন মানুষের মনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে তখন তার জীবনও সেই কেন্দ্র দ্বারা পরিচালিত হয়। কৃষ্ণের মন্মনা ভব নির্দেশ তাই মানুষের অন্তর্জগতের কেন্দ্রকে ঈশ্বরমুখী করার আহ্বান।
ভব শব্দটি সংস্কৃত ভূ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ভূ অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা হয়ে ওঠা। ফলে মন্মনা ভবের অর্থ শুধু আমাকে মনে রেখো নয়। এর গভীর অর্থ হলো এমন হয়ে ওঠো যার মন স্বাভাবিকভাবেই ঈশ্বরের দিকে নিবিষ্ট। এখানে একটি সাময়িক স্মরণের কথা নেই। আছে অন্তরের রূপান্তরের কথা। মানুষ যেন এমন একটি চেতনা অর্জন করে যেখানে ঈশ্বর তার চিন্তার বাইরের কোনো বিষয় না হয়ে তার জীবনের অন্তর্গত কেন্দ্র হয়ে ওঠেন।
এরপর কৃষ্ণ বলেন মদ্ভক্তো। মৎ অর্থ আমার এবং ভক্ত শব্দটি ভজ্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ভজ্ ধাতুর মধ্যে ভাগ করা, অংশ নেওয়া, সেবা করা, উপাসনা করা এবং সম্পর্ক স্থাপনের ভাব রয়েছে। তাই ভক্ত শব্দের অর্থ শুধু কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিকে বোঝায় না। ভক্ত হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ঈশ্বরের সঙ্গে একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেন। সেই সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সেবা, বিশ্বাস এবং আত্মসমর্পণ।
মদ্ভক্তো অর্থ আমার ভক্ত হও। এর গভীর অর্থ হলো নিজের জীবনকে ঈশ্বরের সঙ্গে এমনভাবে সম্পর্কিত করা যেখানে ঈশ্বর কেবল প্রার্থনার সময় স্মরণীয় কোনো সত্তা নন, বরং জীবনের অর্থ ও অভিমুখ নির্ধারণের কেন্দ্র। গভীর ভক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ঈশ্বরকে নিজের ইচ্ছা পূরণের মাধ্যম হিসেবে দেখার পরিবর্তে নিজেকে ঈশ্বরের কাছে নিবেদিত করার মানসিকতা। মানুষ তখন শুধু বলে না ঈশ্বর আমার। বরং তার অন্তরে জন্ম নেয় আমি ঈশ্বরের। এই পরিবর্তন মানুষের অহংকারকে কোমল করে এবং জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেয়।
এরপর আসে মদ্যাজী শব্দটি। যাজী শব্দের মূল রয়েছে যজ্ ধাতুতে। যজ্ অর্থ যজ্ঞ করা, উপাসনা করা এবং নিবেদন করা। মদ্যাজী অর্থ আমাকে উদ্দেশ্য করে যজ্ঞকারী হও। প্রাচীন অর্থে এটি ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে যজ্ঞ ও উপাসনার নির্দেশ হলেও এর দার্শনিক অর্থ আরও বিস্তৃত। যজ্ঞের গভীরে রয়েছে নিবেদনের ধারণা। নিজের শ্রম, জ্ঞান, প্রতিভা এবং কর্মকে বৃহত্তর কোনো উদ্দেশ্যের জন্য উৎসর্গ করা।
এই দৃষ্টিতে একজন শিক্ষক যখন নিষ্ঠার সঙ্গে জ্ঞান দেন, একজন চিকিৎসক যখন মানুষের সেবাকে নিজের কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেন, একজন কর্মজীবী যখন সততার সঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালন করেন এবং একজন মানুষ যখন নিজের সামর্থ্য দিয়ে অন্যের উপকার করেন তখন তাদের কর্মের মধ্যে যজ্ঞের ভাব প্রকাশ পেতে পারে। কর্মের বাহ্যিক রূপ একই থাকতে পারে, কিন্তু কর্মের অন্তরের উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হলে সেই কর্মের আধ্যাত্মিক অর্থও বদলে যায়। গীতার শিক্ষা হলো কর্মকে শুধু ব্যক্তিগত লাভের উপায় না বানিয়ে তাকে একটি উচ্চতর সত্যের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা।
এরপর কৃষ্ণ বলেন মাং নমস্কুরু। মাং অর্থ আমাকে এবং নমস্কুরু শব্দটি নম্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। নম্ অর্থ নত হওয়া বা প্রণত হওয়া। বাহ্যিকভাবে এর অর্থ প্রণাম করা। কিন্তু আধ্যাত্মিক অর্থে প্রণাম হলো অহংকারকে নত করা। মানুষের অন্তরে একটি শক্তিশালী আমি বোধ থাকে। আমি জানি, আমি করি, আমি অর্জন করি, আমার ইচ্ছাই গুরুত্বপূর্ণ এই ধারণাগুলো মানুষকে নিজের চারপাশে একটি অহংকেন্দ্র তৈরি করতে শেখায়। কৃষ্ণের নমস্কুরু সেই অহংকেন্দ্রকে নত করার শিক্ষা দেয়।
প্রকৃত প্রণাম তাই শুধু শরীরের নতি নয়। একজন মানুষ শরীর দিয়ে প্রণাম করতে পারে কিন্তু অন্তরে অহংকার ধরে রাখতে পারে। আবার কেউ নিজের অন্তরের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে কোনো বৃহত্তর সত্যের সামনে নিজেকে নত করতে পারে। দ্বিতীয় অবস্থাটিই আধ্যাত্মিক প্রণামের কাছাকাছি। নমস্কার তখন দুর্বলতার প্রতীক নয়। বরং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে বৃহত্তর সত্যকে গ্রহণ করার শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।
শ্লোকের পরবর্তী অংশে কৃষ্ণ বলেন মামেবৈষ্যসি। মাম্ অর্থ আমাকে এবং এব অর্থ আমাকেই বা একমাত্র আমাকে। এষ্যসি অর্থ তুমি পৌঁছাবে বা লাভ করবে। অর্থাৎ মামেবৈষ্যসি অর্থ তুমি আমাকেই লাভ করবে। এখানে এব শব্দটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কৃষ্ণ শুধু বলছেন না যে তুমি আমাকে লাভ করবে। তিনি বলছেন আমাকেই লাভ করবে। অর্থাৎ মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যকে একটি নির্দিষ্ট অভিমুখ দেওয়া হচ্ছে।
মানুষের জীবনে অসংখ্য লক্ষ্য থাকে। কেউ অর্থকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য মনে করে। কেউ ক্ষমতাকে। কেউ খ্যাতিকে। কেউ সামাজিক সম্মানকে। কেউ নিজের সাফল্যকে। কিন্তু কৃষ্ণ প্রশ্ন করছেন এই সব অর্জনের পরেও মানুষের পরম লক্ষ্য কী। জীবনের সমস্ত ছোট লক্ষ্যকে অতিক্রম করে মানুষ শেষ পর্যন্ত কোন সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে চায়। মামেবৈষ্যসি সেই প্রশ্নের আধ্যাত্মিক উত্তর।
এরপর আসে যুক্ত্বৈবমাত্মানং। যুক্ত্বা শব্দটি যুজ্ ধাতু থেকে এসেছে। যুজ্ অর্থ যুক্ত করা, সংযোগ স্থাপন করা বা মিলিত করা। এই ধাতু থেকেই যোগ শব্দের ধারণা এসেছে। আত্মানং অর্থ নিজেকে। তাই যুক্ত্বা আত্মানং অর্থ নিজেকে যুক্ত করে। এখানে যোগের প্রকৃত অর্থ স্পষ্ট হয়। যোগ শুধু শরীরের কোনো বিশেষ ভঙ্গি নয়। যোগ হলো নিজের বিচ্ছিন্ন শক্তিগুলোকে একটি উচ্চতর সত্যের সঙ্গে যুক্ত করা।
মানুষের মন যদি একদিকে চলে, হৃদয় অন্যদিকে যায় এবং কর্ম আরেকদিকে পরিচালিত হয় তবে জীবনে বিভক্তি তৈরি হয়। কৃষ্ণ সেই বিভক্তি দূর করতে বলছেন। মন ঈশ্বরমুখী হবে, হৃদয় ঈশ্বরের প্রতি ভক্তিতে পূর্ণ হবে, কর্ম ঈশ্বরকে নিবেদিত হবে এবং অহংকার ঈশ্বরের সামনে নত হবে। তখন মানুষের সমগ্র সত্তা একটি অভিন্ন অভিমুখ লাভ করবে। এই হলো যুক্ত্বা আত্মানং এর গভীর তাৎপর্য।
শ্লোকের শেষ শব্দ মৎপরায়ণঃ। মৎ অর্থ আমার এবং পরায়ণ অর্থ যার পরম আশ্রয় বা চূড়ান্ত অভিমুখ কোনো একটি বিষয়। মৎপরায়ণ অর্থ যে আমাকে জীবনের পরম লক্ষ্য করেছে। এই শব্দের মধ্যে ভক্তির পাশাপাশি জীবনের দিকনির্দেশের প্রশ্নও রয়েছে।
মানুষ যতই ব্যস্ত থাকুক, যতই সম্পদ অর্জন করুক, যতই সামাজিক মর্যাদা লাভ করুক, তার জীবনের একটি চূড়ান্ত অভিমুখ থাকে। সে সচেতনভাবে নির্ধারণ করুক বা না করুক, তার চিন্তা ও কর্ম কোনো একটি সর্বোচ্চ মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়। কৃষ্ণ সেই কেন্দ্র হিসেবে পরম সত্যকে গ্রহণ করতে বলছেন। মৎপরায়ণ হওয়া মানে জীবনের সমস্ত কাজ ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং জীবনের সমস্ত কাজকে একটি উচ্চতর উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করা।
এই শ্লোককে মানুষের চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরের আলোকে দেখা যায়। মন্মনা মানুষের মনকে স্পর্শ করে। মদ্ভক্তো হৃদয়কে স্পর্শ করে। মদ্যাজী কর্মকে স্পর্শ করে। মাং নমস্কুরু অহংকারকে স্পর্শ করে। অর্থাৎ কৃষ্ণ মানুষের শুধু চিন্তা পরিবর্তন করতে চান না। তিনি চান চিন্তার সঙ্গে অনুভূতি যুক্ত হোক, অনুভূতির সঙ্গে কর্ম যুক্ত হোক এবং কর্মের সঙ্গে আত্মসমর্পণ যুক্ত হোক। তখন মানুষের জীবন বিচ্ছিন্ন থাকে না। তার মন, হৃদয়, কর্ম এবং অহংকার একই পরম অভিমুখে চলতে শুরু করে।
অদ্বৈত দর্শনের আলোকে এই শ্লোককে চিত্তকে পরম সত্যের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার সাধনা হিসেবে দেখা যায়। মানুষের মন যখন বহির্জগতের অসংখ্য আকর্ষণ থেকে ধীরে ধীরে সরে সত্যের দিকে স্থির হয় তখন চিত্তশুদ্ধি ঘটে এবং আত্মতত্ত্ব উপলব্ধির পথ প্রসারিত হয়। বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে এই শ্লোক ঈশ্বরের সঙ্গে জীবের গভীর সম্পর্ক, ভক্তি এবং আত্মসমর্পণের শিক্ষা বহন করে। দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই ঈশ্বরের প্রতি প্রেম, সেবা এবং ভক্তির মাধ্যমে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের পথ প্রকাশ পায়। দর্শনের ব্যাখ্যা ভিন্ন হলেও সব ক্ষেত্রেই মানুষের জীবনকে একটি পরম সত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আধুনিক জীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজ মানুষের মন অসংখ্য তথ্য, বিজ্ঞাপন, প্রতিযোগিতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নানা আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বিভক্ত। মানুষ একই সঙ্গে অনেক কিছু পেতে চায় এবং ফলে তার মন ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠে। মন্মনা তখন একটি গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে। আমার মনকে আসলে কে পরিচালনা করছে। আমার চিন্তার কেন্দ্র কোথায়। আমি যে বিষয়গুলো প্রতিদিন ভাবছি সেগুলো কি আমাকে কোনো উচ্চতর লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি আমাকে আরও বেশি অস্থির করে তুলছে।
মদ্ভক্তো প্রশ্ন করে আমি কাকে সত্যিই ভালোবাসি। মদ্যাজী প্রশ্ন করে আমার শ্রম এবং প্রতিভা কিসের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। নমস্কুরু প্রশ্ন করে আমি কি নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে পারি। আর মৎপরায়ণ প্রশ্ন করে আমার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী। এই প্রশ্নগুলো শুধু ধর্মীয় জীবনের জন্য নয়। এগুলো মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা এবং জীবনদর্শনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
মানুষের জীবনকে যদি একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয় তবে মন্মনা হলো সেই নদীর গতিপথকে সঠিক দিকে ফিরিয়ে দেওয়া। মদ্ভক্তো হলো সেই গন্তব্যের প্রতি গভীর আকর্ষণ। মদ্যাজী হলো গন্তব্যের দিকে প্রবাহিত হওয়ার জন্য নিজের শক্তিকে কাজে লাগানো। নমস্কুরু হলো নিজের অহংকারকে সরিয়ে দেওয়া। যুক্ত্বা আত্মানং হলো নিজের বিচ্ছিন্ন শক্তিগুলোকে একত্র করা। আর মৎপরায়ণ হলো সেই নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে অবিচলভাবে এগিয়ে চলা।
এই শ্লোকের গভীরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য রয়েছে। মানুষের জীবন মূলত তার অভিমুখ দ্বারা নির্ধারিত হয়। একই কাজ দুইজন মানুষ করতে পারে, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন হলে সেই কাজের অন্তর্নিহিত অর্থও ভিন্ন হয়ে যায়। একজন নিজের অহংকারের জন্য কাজ করতে পারে। অন্যজন একই কাজকে বৃহত্তর কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে পারে। বাহ্যিক কাজ একই হলেও অন্তরের চেতনা ভিন্ন। তাই গীতা শুধু মানুষ কী করছে সেই প্রশ্ন করে না। মানুষ কেন করছে এবং কার উদ্দেশ্যে করছে সেই প্রশ্নও করে।
মন্মনা থেকে মদ্ভক্তো, মদ্যাজী থেকে নমস্কুরু এবং শেষ পর্যন্ত মৎপরায়ণ হওয়া আসলে মানুষের অন্তর্জগতের একটি ধারাবাহিক রূপান্তর। প্রথমে মন ঈশ্বরের দিকে যায়। তারপর হৃদয় ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। এরপর কর্ম ঈশ্বরকে নিবেদিত হয়। তারপর অহংকার নত হয়। শেষে মানুষের সমগ্র জীবন ঈশ্বরমুখী হয়ে ওঠে। তখন মামেবৈষ্যসি শুধু কোনো ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি থাকে না। এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক সত্যের প্রকাশ হয়ে ওঠে। মানুষ যে সত্যকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য করে তার চিন্তা, অনুভূতি, কর্ম এবং চরিত্র ধীরে ধীরে সেই সত্যের দ্বারা গঠিত হয়।
এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণের এই শ্লোকটি এত গভীর। তিনি শুধু বলেন না আমাকে স্মরণ করো। তিনি বলেন তোমার মনকে আমার দিকে ফিরিয়ে দাও, তোমার হৃদয়কে ভক্তিতে পূর্ণ করো, তোমার কর্মকে নিবেদনে পরিণত করো এবং তোমার অহংকারকে আমার সামনে নত করো। নিজের সমগ্র সত্তাকে এইভাবে আমার সঙ্গে যুক্ত করো এবং আমাকে তোমার জীবনের পরম লক্ষ্য করো। তখন তুমি আমাকেই লাভ করবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার এই একটি শ্লোক তাই মানুষের সমগ্র আধ্যাত্মিক জীবনকে একটি সহজ অথচ গভীর সূত্রে প্রকাশ করে। মনকে ঈশ্বরমুখী করা, হৃদয়কে ভক্তিতে পূর্ণ করা, কর্মকে নিবেদনে পরিণত করা এবং অহংকারকে নত করা। এই চারটি যখন একত্রিত হয় তখন জীবন আর কেবল ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সমষ্টি থাকে না। জীবন হয়ে ওঠে এক বৃহত্তর সত্যের দিকে যাত্রা। সেই যাত্রার চূড়ান্ত অভিমুখ হলো মৎপরায়ণতা। অর্থাৎ পরম সত্যকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য করে তার দিকে সম্পূর্ণভাবে অগ্রসর হওয়া। আর এই পথের শেষ ঘোষণা হলো মামেবৈষ্যসি। তুমি আমাকেই লাভ করবে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!