সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.৫ — ঈশ্বর, জীব ও জগতের সম্পর্ক এবং পরমাত্মার ঐশ্বরিক যোগশক্তি

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ন চ মৎস্থানি ভূতানি পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্। ভূতভৃন্ন চ ভূতস্থো মমাত্মা ভূতভাবনঃ।।৫।।…
ন চ মৎস্থানি ভূতানি পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্। 
ভূতভৃন্ন চ ভূতস্থো মমাত্মা ভূতভাবনঃ।।৫।। 

অনুবাদঃ যদিও সব কিছুই আমারই সৃষ্ট, তবুও তারা আমাতে অবস্থিত নয়। আমার যোগৈশ্বর্য দর্শন কর! যদিও আমি সমস্ত জীবের ধারক এবং যদিও আমি সর্বব্যাপ্ত,তবুও আমি এই জড় সৃষ্টির অন্তর্গত নই, কেন না আমি নিজেই সমস্ত সৃষ্টির উৎস।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের পঞ্চম শ্লোকটি ঈশ্বর, জীব ও জগতের সম্পর্ক নিয়ে এক অসাধারণ গভীর সত্য প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, “ন চ মৎস্থানি ভূতানি পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্। ভূতভৃন্ন চ ভূতস্থো মমাত্মা ভূতভাবনঃ।” এই শ্লোকের বাংলা উচ্চারণ হলো “ন চ মৎস্থানি ভূতানি পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্। ভূতভৃন্ন চ ভূতস্থো মমাত্মা ভূতভাবনঃ।” সরল অর্থে এর বক্তব্য হলো, সমস্ত জীব আমার দ্বারা ধারণ ও নিয়ন্ত্রিত হলেও তারা সাধারণ অর্থে আমার মধ্যে অবস্থান করে না। আমার এই ঐশ্বরিক যোগশক্তি দেখো। আমি সমস্ত জীবকে ধারণ করি, কিন্তু কোনো জীবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নই। আমিই সমস্ত জীবের সৃষ্টির কারণ এবং তাদের বিকাশ ও অস্তিত্বের ধারক।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো “ন”। সংস্কৃত ভাষায় এটি নিষেধবাচক অব্যয়। এর অর্থ না, নয় বা নেই। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে “চ”, যার অর্থ এবং বা আর। “ন চ” একত্রে একটি আপাতবিরোধী সত্যের দিকে নিয়ে যায়। কৃষ্ণ যেন বলছেন, পূর্বে যে অর্থে জীবসমূহকে আমার সঙ্গে সম্পর্কিত বলা হয়েছে, সেটিকে সাধারণ স্থানগত অর্থে গ্রহণ করো না। এখানেই শ্লোকটির গভীর দর্শনের সূচনা।

“মৎস্থানি” শব্দটি গঠিত হয়েছে “মৎ” এবং “স্থ” ধারণার সমন্বয়ে। “মৎ” অর্থ আমার এবং “স্থ” এসেছে সংস্কৃত “স্থা” ধাতু থেকে, যার অর্থ দাঁড়ানো, থাকা বা অবস্থান করা। তাই “মৎস্থানি” বলতে বোঝায় আমার মধ্যে অবস্থিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে “ভূতানি” শব্দ। “ভূতানি” এসেছে “ভূ” ধাতু থেকে। “ভূ” অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। তাই “ভূত” বলতে শুধু প্রচলিত অর্থের কোনো অদৃশ্য সত্তাকে বোঝায় না। গীতার ভাষায় ভূত বলতে বোঝায় যে কোনো সৃষ্ট সত্তা বা অস্তিত্ব লাভ করা জীব। “ভূতানি” তার বহুবচন। অর্থাৎ সমস্ত জীবসত্তা, সমস্ত সৃষ্ট অস্তিত্ব এবং জগতের বহুমাত্রিক প্রকাশ।

এরপর কৃষ্ণ বলেন “পশ্য”। এই শব্দটি এসেছে “দৃশ্” ধাতু থেকে, যার অর্থ দেখা বা দর্শন করা। “পশ্য” হলো আদেশাত্মক রূপ। অর্থাৎ দেখো, উপলব্ধি করো বা প্রত্যক্ষ করো। এই একটি শব্দ শ্লোকটির আধ্যাত্মিক গভীরতা অনেক বাড়িয়ে দেয়। কৃষ্ণ শুধু অর্জুনকে কোনো তত্ত্ব বিশ্বাস করতে বলছেন না। তিনি তাকে দেখতে বলছেন। এখানে দেখা মানে কেবল চোখ দিয়ে কোনো বস্তু দেখা নয়। ভারতীয় দর্শনের ভাষায় দর্শন হলো সত্যকে উপলব্ধি করা। তাই “পশ্য” যেন মানুষের চেতনাকে বাহ্যিক জগতের দৃশ্যমান রূপ অতিক্রম করে অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করার আহ্বান জানায়।

“মে” অর্থ আমার। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে “যোগমৈশ্বরম্”। এই শব্দটি শ্লোকটির অন্যতম গভীর ধারণা। “যোগ” শব্দের সঙ্গে “যুজ্” ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে এবং এর মধ্যে সংযোগ, সমন্বয়, ঐক্য ও বিশেষ আধ্যাত্মিক শক্তির ধারণা রয়েছে। কিন্তু এখানে যোগ কেবল সাধনার কোনো পদ্ধতি নয়। এখানে এটি ঈশ্বরের সেই রহস্যময় শক্তি যার দ্বারা তিনি একই সঙ্গে জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং জগতের সীমার অতীত। “ঐশ্বর” শব্দটি ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এর মধ্যে প্রভুত্ব, নিয়ন্ত্রণ, অসীম ক্ষমতা ও ঈশ্বরীয় মহিমার ধারণা রয়েছে। তাই “যোগমৈশ্বরম্” অর্থ ঈশ্বরের ঐশ্বরিক যোগশক্তি। কৃষ্ণ অর্জুনকে সেই রহস্য দেখতে বলছেন যার দ্বারা তিনি জগতকে ধারণ করেন অথচ জগতের দ্বারা আবদ্ধ হন না।

এরপর আসে “ভূতভৃত্” শব্দটি। এটি গঠিত হয়েছে “ভূত” এবং “ভৃত্” ধারণার সমন্বয়ে। “ভৃত্” এসেছে “ভৃ” ধাতু থেকে। “ভৃ” অর্থ ধারণ করা, বহন করা, পালন করা বা ধরে রাখা। ফলে “ভূতভৃত্” অর্থ যিনি সমস্ত জীবকে ধারণ করেন, যিনি সমস্ত সৃষ্টিকে আশ্রয় দেন এবং যাঁর উপর জীবের অস্তিত্ব নির্ভর করে। এই শব্দটির মধ্যে ঈশ্বরের ধারক সত্তার ধারণা প্রকাশ পেয়েছে। মানুষ নিজের অস্তিত্বকে অনেক সময় স্বাধীন বলে মনে করে। কিন্তু তার জীবন প্রকৃতি, বায়ু, জল, খাদ্য, সূর্যালোক, সমাজ এবং অসংখ্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্য শক্তির উপর নির্ভরশীল। গীতার দৃষ্টিতে এই সমগ্র নির্ভরতার গভীরে রয়েছে পরম সত্তার ধারণক্ষমতা।

“ভূতস্থঃ” শব্দটি এসেছে “ভূত” এবং “স্থ” থেকে। অর্থ হলো জীবের মধ্যে অবস্থানকারী বা জীবের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো কৃষ্ণ বলেন “ন চ ভূতস্থঃ”। অর্থাৎ আমি জীবের মধ্যে অবস্থানকারী নই। প্রথমে তিনি বলেন জীবসমূহ আমার মধ্যে নেই। পরে বলেন তিনিও জীবের মধ্যে নেই। এই বক্তব্যকে সাধারণ স্থানগত অর্থে নিলে শ্লোকটি পরস্পরবিরোধী মনে হয়। কিন্তু কৃষ্ণ এখানে কোনো ভৌত অবস্থানের কথা বলছেন না। তিনি ঈশ্বর ও জগতের অস্তিত্বগত সম্পর্কের কথা বলছেন। জীব ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল হতে পারে, কিন্তু ঈশ্বর কোনো জীবের দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। ঈশ্বরের উপস্থিতি কোনো নির্দিষ্ট স্থান, দেহ বা বস্তুর মধ্যে আবদ্ধ নয়।

“মম আত্মা” অর্থ আমার আত্মস্বরূপ বা আমার নিজস্ব চৈতন্যসত্তা। “আত্মা” শব্দটির অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত। এটি আত্মসত্তা, অন্তঃসত্তা, চৈতন্য, স্বরূপ বা পরম সত্তা বোঝাতে পারে। এখানে কৃষ্ণের আত্মা বলতে কোনো ব্যক্তিগত দেহের অন্তর্গত ক্ষুদ্র আত্মাকে বোঝানো হয় না। বরং তাঁর পরম স্বরূপ এবং চৈতন্যসত্তার কথা বোঝানো হয়েছে। এই ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে “ভূতভাবনঃ”। এটি এমন এক যৌগিক পদ যার মধ্যে “ভূত” এবং “ভাবন” ধারণা রয়েছে। “ভাব” অর্থ অস্তিত্ব, প্রকাশ, অবস্থা বা বিকাশ। তাই “ভূতভাবনঃ” অর্থ যিনি জীবসমূহকে অস্তিত্ব দান করেন, যিনি তাদের সৃষ্টি করেন এবং তাদের বিকাশ ও ধারাবাহিক অস্তিত্বের কারণ।

এই কয়েকটি শব্দ একত্রে শ্লোকটির মূল দর্শন প্রকাশ করে। কৃষ্ণ একই সঙ্গে “ভূতভাবনঃ”, অর্থাৎ জীবসৃষ্টির কারণ, “ভূতভৃত্”, অর্থাৎ জীবের ধারক এবং “ন চ ভূতস্থঃ”, অর্থাৎ জীবের দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। এই তিনটি ধারণা একসঙ্গে না বুঝলে শ্লোকটির সৌন্দর্য উপলব্ধি করা যায় না। ঈশ্বর সৃষ্টি করেন, সৃষ্টি ধারণ করেন এবং সৃষ্টিকে অতিক্রম করেও থাকেন। তিনি জগতের কারণ, কিন্তু জগত তাঁকে সম্পূর্ণভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না।

এই সত্য বোঝার জন্য সমুদ্র ও তরঙ্গের উপমা অত্যন্ত সুন্দর। অসংখ্য তরঙ্গ সমুদ্রের উপর নির্ভরশীল। তরঙ্গের অস্তিত্ব সমুদ্র ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু সমুদ্র কোনো একটি তরঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি তরঙ্গের জন্ম হয়, কিছুক্ষণ থাকে এবং আবার বিলীন হয়। কিন্তু সমুদ্র তার থেকেও বৃহত্তর। তেমনই অসংখ্য জীব ও জগতের পরিবর্তনশীল রূপের পেছনে একটি বৃহত্তর অস্তিত্ব রয়েছে। জীব সেই বৃহত্তর বাস্তবতার উপর নির্ভরশীল হলেও পরম বাস্তবতা কোনো একক জীবের সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়।

আরেকটি আধুনিক উপমা হতে পারে একটি পর্দায় চলমান চলচ্চিত্র। পর্দায় কখনো আনন্দের দৃশ্য দেখা যায়, কখনো দুঃখের দৃশ্য, কখনো যুদ্ধ, কখনো শান্তি। দৃশ্যের পরিবর্তন হয়, চরিত্রের পরিবর্তন হয়, গল্পের পরিবর্তন হয়। কিন্তু পর্দা প্রত্যেক দৃশ্যকে ধারণ করে এবং কোনো নির্দিষ্ট দৃশ্যের দ্বারা আবদ্ধ হয় না। দৃশ্যের প্রকাশ পর্দার উপর নির্ভরশীল, কিন্তু পর্দার অস্তিত্ব কোনো নির্দিষ্ট দৃশ্যের উপর নির্ভরশীল নয়। ঈশ্বর ও জগতের সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে এই উপমাটি আংশিকভাবে সেই গভীর সত্যকে প্রকাশ করে।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। অদ্বৈত দর্শনে পরম ব্রহ্মই চূড়ান্ত সত্য। বহুত্বের জগৎ ব্রহ্মের উপর নির্ভরশীল হলেও ব্রহ্ম কোনো সীমাবদ্ধ জাগতিক রূপের দ্বারা আবদ্ধ নয়। তাই জীব ও জগতের সঙ্গে পরম সত্তার সম্পর্ককে সাধারণ বস্তুগত সম্পর্ক দিয়ে বিচার করা যায় না। জগতের অস্তিত্ব ব্রহ্মের উপর নির্ভরশীল হলেও ব্রহ্মের পরিপূর্ণতা জগতের কোনো নির্দিষ্ট অবস্থার উপর নির্ভর করে না।

বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের আলোকে বিষয়টি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ঈশ্বর, জীব এবং জগতের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। জীব ও জগত ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল এবং ঈশ্বর তাদের অন্তর্যামী। ঈশ্বর সর্বত্র উপস্থিত হলেও কোনো নির্দিষ্ট জীব বা বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। অন্যদিকে দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের মৌলিক পার্থক্য বজায় থাকে। সেখানে জীব ঈশ্বরের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, কিন্তু ঈশ্বর জীবের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যান না। ফলে বিভিন্ন বেদান্তীয় ব্যাখ্যার মধ্যেও একটি সাধারণ সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঈশ্বরের সঙ্গে জীবের সম্পর্ক গভীর, কিন্তু ঈশ্বর কোনো সীমাবদ্ধ জীবসত্তার দ্বারা আবদ্ধ নন।

এই শ্লোকের মনোবৈজ্ঞানিক তাৎপর্যও রয়েছে। মানুষ প্রায়ই নিজের নাম, পরিচয়, সাফল্য, ব্যর্থতা, সামাজিক অবস্থান, চিন্তা ও আবেগকে নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় মনে করে। কিন্তু গীতার আত্মতত্ত্ব মানুষকে আরও গভীরে যেতে বলে। যে ব্যক্তি নিজের চিন্তাকে দেখতে পারে, সে কি কেবল সেই চিন্তা। যে নিজের দুঃখকে অনুভব করতে পারে, সে কি কেবল দুঃখ। যে নিজের পরিবর্তনশীল মানসিক অবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করতে পারে, তার মধ্যে কি কোনো গভীরতর সচেতনতা নেই। “পশ্য” শব্দটি তাই বাহ্যিক জগতকে দেখার পাশাপাশি নিজের অন্তর্জগতকে দেখারও আহ্বান।

মানবজীবনের ক্ষেত্রেও “ভূতভৃত্” একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। মানুষ যত বড় সাফল্য অর্জন করুক, তার অস্তিত্ব কখনো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়। একজন মানুষের খাদ্য উৎপাদনের পেছনে কৃষকের শ্রম রয়েছে। তার জ্ঞানের পেছনে শিক্ষকের অবদান রয়েছে। তার জীবনের পেছনে পরিবার, সমাজ, প্রকৃতি এবং অসংখ্য মানুষের অদৃশ্য সহযোগিতা রয়েছে। তাই “আমি একাই সব করেছি” এই অহংকার বাস্তবতার সম্পূর্ণ চিত্র নয়। গীতার শিক্ষা মানুষকে নিজের সাফল্যের মধ্যে বৃহত্তর অস্তিত্বের অবদান উপলব্ধি করতে শেখায়। সেখান থেকেই কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধের জন্ম হয়।

এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও গভীর। “ভূতানি” হলো বহুত্বের প্রতীক। পৃথিবীতে অসংখ্য জীব, অসংখ্য চরিত্র, অসংখ্য অভিজ্ঞতা এবং অসংখ্য অস্তিত্বের প্রকাশ রয়েছে। “ভূতভৃত্” হলো সেই বহুত্বকে ধারণকারী ঐক্যের প্রতীক। “ভূতভাবনঃ” হলো সমস্ত প্রকাশের উৎসের প্রতীক। আর “যোগমৈশ্বরম্” হলো সেই রহস্যময় শক্তির প্রতীক যা বহুত্বের মধ্যে ঐক্য এবং পরিবর্তনের মধ্যে স্থায়িত্বকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।

এই কারণে শ্লোকটি শুধু ধর্মীয় উপদেশ নয়। এটি অস্তিত্বের প্রকৃতি নিয়ে একটি গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান। মানুষ কোথা থেকে এসেছে, তার অস্তিত্ব কিসের উপর নির্ভর করে, জগতের সঙ্গে পরম সত্যের সম্পর্ক কী এবং পরম সত্য কি জগতের দ্বারা সীমাবদ্ধ হতে পারে, এই প্রশ্নগুলোর দিকে শ্লোকটি আমাদের নিয়ে যায়। এখানে ঈশ্বরকে কেবল কোনো দূরবর্তী সত্তা হিসেবে দেখা হয় না। তিনি সমস্ত অস্তিত্বের কারণ ও ধারক। আবার তাঁকে কেবল জগতের সমান করেও দেখা হয় না। তিনি জগতের অতীত এবং জগতের সীমার ঊর্ধ্বে।

সবশেষে বলা যায়, “ন চ মৎস্থানি ভূতানি” থেকে “ভূতভাবনঃ” পর্যন্ত প্রতিটি শব্দ ঈশ্বর ও জগতের সম্পর্কের একটি একটি স্তর উন্মোচন করে। “ভূতানি” আমাদের বহুমাত্রিক জগতের কথা বলে। “ভূতভৃত্” জানায় যে সেই জগতের অস্তিত্ব একটি বৃহত্তর আশ্রয়ের উপর নির্ভরশীল। “ভূতভাবনঃ” জানায় যে সমস্ত সৃষ্টির উৎস ও বিকাশের পেছনে একটি পরম কারণ রয়েছে। আর “যোগমৈশ্বরম্” প্রকাশ করে সেই রহস্যময় ঐশ্বরিক শক্তিকে যার দ্বারা ঈশ্বর সৃষ্টি করেন, ধারণ করেন এবং তবু সৃষ্টির দ্বারা সীমাবদ্ধ হন না। তাই এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা হলো ঈশ্বরকে কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা সীমিত রূপের মধ্যে আবদ্ধ করে বোঝা যায় না। তিনি অস্তিত্বের আশ্রয়, সৃষ্টির কারণ, জীবনের ধারক এবং একই সঙ্গে সমস্ত সীমাবদ্ধতার অতীত পরম সত্য। কৃষ্ণের “পশ্য” তাই কেবল অর্জুনের উদ্দেশে বলা একটি শব্দ নয়। এটি প্রত্যেক মানুষের জন্য এক চিরন্তন আহ্বান। বাহ্যিক বহুত্বের আড়ালে যে গভীর ঐক্য, পরিবর্তনশীল জীবনের অন্তরালে যে স্থায়ী সত্য এবং ব্যক্তিগত অস্তিত্বের গভীরে যে পরম চৈতন্য, তাকে দেখতে শেখাই এই শ্লোকের প্রকৃত সাধনা।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি