শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.৬ — আকাশ ও বায়ুর উপমায় ঈশ্বর, জগৎ ও জীবের গভীর সম্পর্ক
যথাকাশস্থিতো নিত্যং বায়ুঃ সর্বত্রগো মহান্।
তথা সর্বাণি ভূতানি মৎস্থানীত্যুপধারয়।।৬।।
অনুবাদঃ অবগত হও যে, মহান বায়ু যেমন সর্বত্র বিচরণশীল হওয়া সত্ত্বেও সর্বদা আকাশে অবস্থান করে, তেমনই সমস্ত সৃষ্ট জীব আমাতে অবস্থান করে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকটি ঈশ্বর, জগৎ এবং জীবের পারস্পরিক সম্পর্ককে বোঝানোর জন্য একটি অত্যন্ত গভীর ও সুন্দর উপমা ব্যবহার করেছে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, যেমন সর্বত্রগামী মহান বায়ু সর্বদা আকাশে অবস্থান করে, তেমনি সমস্ত জীব ও সৃষ্ট সত্তা তাঁর মধ্যে অবস্থান করে। এই সত্যকে উপলব্ধি করতে তিনি অর্জুনকে আহ্বান জানান। শ্লোকটির মূল বক্তব্য খুব সহজ মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত দর্শন অত্যন্ত গভীর। এখানে প্রকৃতির একটি সাধারণ দৃশ্যের মাধ্যমে এমন এক অস্তিত্বতত্ত্ব প্রকাশ করা হয়েছে, যা ভারতীয় দর্শনের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।
শ্লোকটির শুরু হয়েছে “যথা” শব্দ দিয়ে। “যথা” অর্থ যেমন বা যেভাবে। এই শব্দের মাধ্যমে কৃষ্ণ একটি উপমার সূচনা করেছেন। তিনি কোনো দুর্বোধ্য তাত্ত্বিক ধারণা সরাসরি ব্যাখ্যা না করে প্রকৃতির পরিচিত একটি সম্পর্ককে সামনে এনেছেন। সেই সম্পর্ক হলো আকাশ ও বায়ুর সম্পর্ক। “আকাশস্থিতো” শব্দের মধ্যে রয়েছে আকাশ এবং স্থিত ধারণা। স্থিত শব্দটি সংস্কৃত √স্থা ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ দাঁড়ানো, অবস্থান করা, প্রতিষ্ঠিত থাকা। তাই আকাশস্থিতো অর্থ আকাশে অবস্থানকারী। এরপর এসেছে “নিত্যম্”। এর অর্থ সর্বদা, নিয়ত বা অবিরাম। অর্থাৎ বায়ু সাময়িকভাবে আকাশের মধ্যে অবস্থান করছে এমন নয়। তার সমস্ত গতি ও প্রবাহ আকাশের বিস্তৃত পরিসরের মধ্যেই সংঘটিত হয়।
“বায়ু” শব্দটি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ অর্থে বায়ু হলো বাতাস। কিন্তু ভারতীয় চিন্তায় বায়ু শুধু একটি ভৌত উপাদান নয়। বায়ুর সঙ্গে গতি, প্রবাহ, প্রাণ এবং পরিবর্তনের ধারণাও যুক্ত। বায়ু কখনো স্থির নয়। সে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়। তার গতিপথ পরিবর্তিত হয়। কখনো সে মৃদু, কখনো প্রবল। কখনো শান্ত, কখনো ঝড়ের মতো অস্থির। এই কারণেই বায়ু পরিবর্তনশীল জগতের একটি শক্তিশালী প্রতীক। তার সঙ্গে “সর্বত্রগো” শব্দটি যুক্ত হয়েছে। সর্বত্র অর্থ সব জায়গায় এবং গ শব্দটি এসেছে √গম্ ধাতু থেকে, যার অর্থ যাওয়া বা গমন করা। তাই সর্বত্রগো অর্থ সর্বত্রগামী। “মহান্” শব্দটি আবার বায়ুর ব্যাপকতা ও বিশালতাকে নির্দেশ করে।
এরপর শ্লোকটি হঠাৎ প্রকৃতির দৃশ্য থেকে মানুষের অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করে। কৃষ্ণ বলেন “তথা সর্বাণি ভূতানি”। “সর্বাণি” অর্থ সমস্ত এবং “ভূতানি” অর্থ সমস্ত সৃষ্ট সত্তা বা অস্তিত্বশীল জীব। ভূত শব্দটি এসেছে √ভূ ধাতু থেকে। এই ধাতুর অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। তাই ভূত বলতে কেবল মানুষকে বোঝানো হয় না। সমস্ত জীব, সমস্ত সৃষ্ট সত্তা এবং অস্তিত্ব লাভ করা সমস্ত কিছুকেই এখানে বোঝানো যেতে পারে। অর্থাৎ কৃষ্ণের বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট জাতি, প্রাণী বা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের কথা বলছেন।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর একটি হলো “মৎস্থানী”। শব্দটি মৎ এবং স্থানী ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। মৎ এসেছে মদ্ সর্বনাম থেকে, যার অর্থ আমি বা আমার। স্থান শব্দের সঙ্গে রয়েছে √স্থা ধাতুর সম্পর্ক। স্থান মানে অবস্থান, আশ্রয় বা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র। ফলে মৎস্থানী বলতে বোঝায় আমার মধ্যে অবস্থানকারী বা আমার আশ্রয়ে প্রতিষ্ঠিত। তবে এখানে “আমার মধ্যে” কথাটিকে সাধারণ ভৌত অর্থে গ্রহণ করলে শ্লোকটির প্রকৃত দার্শনিক তাৎপর্য ধরা পড়বে না। কৃষ্ণ কোনো পাত্রের মধ্যে বস্তু থাকার মতো একটি সাধারণ স্থানিক সম্পর্ক বোঝাচ্ছেন না। এখানে মূলত অস্তিত্বগত নির্ভরতার কথা বলা হয়েছে। সমস্ত সৃষ্টির অস্তিত্ব একটি পরম ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল। সেই ভিত্তিই কৃষ্ণ নিজের মধ্যে নির্দেশ করছেন।
শেষে এসেছে “ইত্যুপধারয়”। উপধারয় শব্দের মধ্যে √ধৃ ধাতুর ভাব রয়েছে। ধৃ অর্থ ধারণ করা বা ধরে রাখা। উপধারয় অর্থ বুঝে নাও, উপলব্ধি করো বা এই সত্যকে মনে ধারণ করো। এই শব্দটির মধ্যেই শ্লোকটির আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৃষ্ণ শুধু অর্জুনকে একটি তথ্য জানাচ্ছেন না। তিনি তাকে একটি সত্য উপলব্ধি করতে বলছেন। জ্ঞান যখন কেবল বুদ্ধিতে থাকে তখন তা তথ্য। কিন্তু যখন সেই জ্ঞান মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে তখন তা উপলব্ধি হয়ে ওঠে। কৃষ্ণের আহ্বান সেই গভীর উপলব্ধির দিকে।
শ্লোকটির আক্ষরিক অর্থ হলো, যেমন সর্বত্রগামী মহান বায়ু সর্বদা আকাশে অবস্থান করে, তেমনি সমস্ত জীব আমার মধ্যে অবস্থান করে। এইভাবে তুমি তা উপলব্ধি করো। কিন্তু এই সরল অনুবাদের মধ্যে একটি গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। সমস্ত জীব যদি ঈশ্বরের মধ্যে অবস্থান করে, তাহলে ঈশ্বর ও জগতের সম্পর্ক কী। ঈশ্বর কি জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। জগৎ কি ঈশ্বরেরই অন্য একটি রূপ। নাকি জগৎ ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল হলেও ঈশ্বর জগতের অতীত। গীতার নবম অধ্যায়ের পূর্ববর্তী শ্লোকগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে কৃষ্ণ এখানে এমন এক সম্পর্কের কথা বলছেন যেখানে জগত তাঁর ওপর নির্ভরশীল হলেও তিনি জগতের দ্বারা সীমাবদ্ধ নন।
আকাশ ও বায়ুর উপমাটি এই সত্যকে বোঝার জন্য অসাধারণ। বায়ু আকাশের মধ্যে চলাচল করে। বায়ু ছাড়া আমরা তার গতি অনুভব করতে পারি, কিন্তু বায়ুর অস্তিত্বের জন্য আকাশের বিস্তৃত পরিসর প্রয়োজন। বায়ু পরিবর্তিত হয়, আকাশ সেই পরিবর্তনের দ্বারা একইভাবে পরিবর্তিত হয় না। ঝড় আসে, বাতাস থেমে যায়, আবার প্রবাহিত হয়। কিন্তু আকাশ সবকিছুকে ধারণ করে থাকে। এই সম্পর্কের মধ্যেই কৃষ্ণ একটি গভীর অস্তিত্বতাত্ত্বিক শিক্ষা দিয়েছেন। জগতের সমস্ত পরিবর্তনশীল সত্তা একটি বৃহত্তর পরম ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। অদ্বৈত মতে ব্রহ্মই পরম সত্য। নাম, রূপ এবং জগতের পরিবর্তনশীল প্রকাশের অন্তরালে রয়েছে এক অখণ্ড বাস্তবতা। আকাশ ও বায়ুর উপমায় বায়ু যেমন আকাশের মধ্যে অবস্থান করে, তেমনি জগতের সমস্ত প্রকাশ ব্রহ্মের ওপর নির্ভরশীল। তবে ব্রহ্মকে জগতের কোনো একটি সীমাবদ্ধ রূপ হিসেবে ধরা যায় না। পরিবর্তনশীল জগৎ ব্রহ্মের ওপর নির্ভরশীল হলেও ব্রহ্ম নিজে পরিবর্তনশীল জগতের মতো সীমাবদ্ধ নন।
বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে এই শ্লোককে ঈশ্বর, জীব এবং জগতের গভীর সম্পর্কের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। জীব ও জগত বাস্তব এবং তারা ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল। সমস্ত সত্তা ঈশ্বরের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু ঈশ্বর তাদের দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। এই দৃষ্টিতে মৎস্থানী ধারণাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। সমস্ত অস্তিত্ব ঈশ্বরের আশ্রিত, কিন্তু ঈশ্বরের অস্তিত্ব কোনো সৃষ্ট সত্তার ওপর নির্ভর করে না।
দ্বৈত দর্শনের দৃষ্টিতেও ঈশ্বর ও জীবের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জীব ঈশ্বর নয় এবং জগতও ঈশ্বর নয়। কিন্তু জীব ও জগত ঈশ্বরের ওপর নির্ভরশীল। এই ব্যাখ্যায় মৎস্থানী অর্থ দাঁড়ায় সমস্ত জীব ঈশ্বরের আশ্রিত এবং তাঁর দ্বারা ধারণকৃত। ফলে বিভিন্ন দর্শন এই শ্লোককে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করলেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমস্ত সৃষ্টির অস্তিত্বের পেছনে একটি পরম ভিত্তির ধারণা এখানে কেন্দ্রীয়।
শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। আকাশ এখানে অসীমতা, ব্যাপ্তি, ধারণক্ষমতা এবং গভীর অস্তিত্বের প্রতীক। বায়ু হলো গতি, পরিবর্তন, প্রাণ ও অস্থিরতার প্রতীক। আর সমস্ত ভূত হলো পরিবর্তনশীল জগতের প্রতীক। এই তিনটি ধারণাকে পাশাপাশি রাখলে একটি গভীর চিত্র তৈরি হয়। পরিবর্তনশীল জীবন একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের পরিসরের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে। জীবন চলমান, কিন্তু সেই চলমানতার পেছনে রয়েছে একটি বৃহত্তর ভিত্তি।
মানবজীবনের সঙ্গে এই শিক্ষার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের চিন্তা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। আজ যে চিন্তা সত্য বলে মনে হয়, কাল তা বদলে যেতে পারে। আনন্দ আসে এবং চলে যায়। দুঃখ আসে এবং একসময় তার তীব্রতাও কমে যায়। সাফল্য আসে, আবার ব্যর্থতাও আসে। মানুষ প্রশংসা পায়, আবার সমালোচনার মুখোমুখি হয়। কিন্তু মানুষ যদি প্রতিটি পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতাকেই নিজের সম্পূর্ণ পরিচয় মনে করে, তাহলে তার মনও প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে দুলতে থাকে। আকাশ ও বায়ুর উপমা এখানে একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি দেয়। পরিবর্তনশীল অভিজ্ঞতা জীবনের অংশ হলেও মানুষ তার অভিজ্ঞতার চেয়েও গভীর এক অস্তিত্বের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে।
একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। বিশাল আকাশের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই মেঘ চলেছে। কখনো সাদা মেঘ, কখনো কালো মেঘ। কখনো আকাশ পরিষ্কার, কখনো বৃষ্টি। কিন্তু মেঘের আগমন ও প্রস্থান আকাশের বিশালতাকে শেষ করে দেয় না। মানুষের মনও অনেকটা এমন। চিন্তা হলো মেঘের মতো। আবেগও মেঘের মতো। আনন্দ, দুঃখ, সাফল্য, ব্যর্থতা সবই জীবনের পরিবর্তনশীল প্রকাশ। গীতার শিক্ষা মানুষকে এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটি বৃহত্তর সত্যের সন্ধান করতে আহ্বান জানায়।
এই কারণে “মৎস্থানী” শব্দটি শুধু একটি ব্যাকরণগত পদ নয়। এর মধ্যে রয়েছে অস্তিত্বের গভীর দর্শন। মানুষ নিজের অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলে মনে করলেও গীতা তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে তার অস্তিত্ব একটি বৃহত্তর বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তার শরীর প্রকৃতির অংশ। তার জীবন বহু পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। তার শ্বাস, খাদ্য, পরিবেশ, সমাজ এবং প্রকৃতি সবকিছুই তাকে ধারণ করে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এই নির্ভরতার সর্বোচ্চ ভিত্তি হলো পরমসত্তা।
এই উপলব্ধি মানুষের অহংবোধকেও পরিবর্তন করতে পারে। মানুষ যখন ভাবে সবকিছু তার নিজের শক্তিতে হচ্ছে, তখন অহংকার জন্মায়। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে তার জীবন একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের জালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত, তখন কৃতজ্ঞতা জন্ম নিতে পারে। নিজের সাফল্যকে কেবল নিজের কৃতিত্ব হিসেবে না দেখে বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে তার সম্পর্ক অনুভব করা যায়। এই উপলব্ধি মানুষের মধ্যে বিনয় এবং দায়িত্ববোধ তৈরি করতে পারে।
গীতার দৃষ্টিতে এই শ্লোক তাই শুধু ঈশ্বরতত্ত্বের আলোচনা নয়। এটি মানুষের জীবনদর্শনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। পরিবর্তনকে অস্বীকার করতে হবে না। বরং পরিবর্তনের মধ্যেই স্থিতির সন্ধান করতে হবে। বায়ুকে থামিয়ে আকাশকে পাওয়া যায় না। তেমনি জীবনকে থামিয়ে আধ্যাত্মিক সত্য উপলব্ধি করতে হবে এমন নয়। জীবন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। মানুষের কাজ হলো সেই গতির মধ্যেও নিজের অস্তিত্বের গভীর ভিত্তিকে উপলব্ধি করা।
এই শ্লোকের সাহিত্যিক সৌন্দর্য এখানেই যে কৃষ্ণ একটি সাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্যকে মহৎ দার্শনিক প্রতীকে পরিণত করেছেন। আকাশে বায়ুর চলাচল প্রত্যেক মানুষের পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু সেই দৃশ্যের মধ্যে তিনি ঈশ্বর ও সৃষ্টির সম্পর্ক দেখতে শেখাচ্ছেন। প্রকৃতি এখানে কেবল প্রকৃতি নয়। প্রকৃতি হয়ে উঠেছে দর্শনের ভাষা। বায়ু হয়ে উঠেছে পরিবর্তনের প্রতীক। আকাশ হয়ে উঠেছে অসীমতার প্রতীক। আর তাদের সম্পর্ক হয়ে উঠেছে নির্ভরশীল অস্তিত্বের প্রতীক।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের এই শ্লোক তাই মানুষের সামনে একটি গভীর সত্য উন্মোচন করে। আমরা পরিবর্তনশীল জগতের অংশ। আমাদের জীবন প্রবাহিত হয়। আমাদের চিন্তা বদলে যায়। আমাদের আবেগ পরিবর্তিত হয়। আমাদের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়। কিন্তু এই পরিবর্তনশীলতার পেছনে একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের ভিত্তি রয়েছে। কৃষ্ণ সেই ভিত্তিকে নিজের মধ্যে নির্দেশ করে বলেন যে সমস্ত ভূত তাঁর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। তিনি অর্জুনকে শুধু শুনতে বলেননি। বলেছেন উপলব্ধি করতে। কারণ আধ্যাত্মিক সত্যের প্রকৃত মূল্য তখনই যখন তা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।
সবশেষে বলা যায়, “যথাকাশস্থিতো নিত্যং বায়ুঃ সর্বত্রগো মহান্, তথা সর্বাণি ভূতানি মৎস্থানীত্যুপধারয়” শ্লোকটি আমাদের শেখায় যে পরিবর্তনশীল জীবনের পেছনে রয়েছে এক বৃহত্তর অস্তিত্বের ভিত্তি। বায়ু যেমন আকাশে অবস্থান করে এবং আকাশের বিস্তৃতির মধ্যে তার সমস্ত গতি সম্পন্ন করে, তেমনি সমস্ত জীব ও সৃষ্ট সত্তা পরমসত্তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই উপলব্ধি মানুষকে অহংকার থেকে বিনয়ের দিকে, অস্থিরতা থেকে অন্তর্গত স্থিরতার দিকে এবং বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি থেকে বৃহত্তর অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই কারণেই গীতার এই ছোট্ট শ্লোকটি কেবল একটি ধর্মীয় বাক্য নয়। এটি অস্তিত্ব, ঈশ্বর, জগৎ এবং মানুষের নিজের পরিচয় সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করার একটি আহ্বান।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!