সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.৭ — কল্পের সৃষ্টি ও প্রলয়, প্রকৃতিতে জীবের লয় এবং ঈশ্বরের সৃষ্টিতত্ত্ব

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
সর্বভূতানি কৌন্তেয় প্রকৃতিং যান্তি মামিকাম্। কল্পক্ষয়ে পুনস্তানি কল্পাদৌ বিসৃজাম্যহম্।।৭।।
সর্বভূতানি কৌন্তেয় প্রকৃতিং যান্তি মামিকাম্। 
কল্পক্ষয়ে পুনস্তানি কল্পাদৌ বিসৃজাম্যহম্।।৭।।

অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! কল্পান্তে সমস্ত জড় সৃষ্টি আমারই প্রকৃতিতে প্রবেশ করে এবং পুনরায় কল্পারম্ভে প্রকৃতির দ্বারা আমি তাদের সৃষ্টি করি। 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে উদ্দেশ করে বলেন, “হে কৌন্তেয়, কল্পের অবসানে সমস্ত জীব আমার প্রকৃতিতে লীন হয় এবং কল্পের আদিতে আমি তাদের পুনরায় প্রকাশ করি।” এই একটি শ্লোকের মধ্যে সৃষ্টি, স্থিতি, লয়, প্রকৃতি, কাল, জীব এবং ঈশ্বরের পারস্পরিক সম্পর্কের এক গভীর দার্শনিক সত্য প্রকাশিত হয়েছে। এটি শুধু মহাবিশ্ব কীভাবে সৃষ্টি হয় এবং কীভাবে বিলীন হয় তার একটি ব্যাখ্যা নয়। মানুষের জীবন, পরিবর্তন, অনিত্যতা এবং অস্তিত্বের গভীর রহস্য বোঝার ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের তাৎপর্য অসাধারণ।

শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ সর্বভূতানি। সর্ব অর্থ সমস্ত এবং ভূত শব্দটি সংস্কৃত √ভূ ধাতু থেকে এসেছে। √ভূ অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা প্রকাশিত হওয়া। সেই অর্থে ভূত বলতে শুধু কোনো নির্দিষ্ট প্রাণীকে বোঝায় না। যা অস্তিত্ব লাভ করেছে বা প্রকাশিত হয়েছে, তা ভূত। তাই সর্বভূতানি বলতে সমস্ত জীব, সমস্ত সৃষ্ট সত্তা এবং প্রকাশিত জগতের বহুবিধ অস্তিত্বকে বোঝানো হয়েছে। কৃষ্ণ এখানে কোনো বিশেষ জাতি, শ্রেণি বা প্রজাতির কথা বলছেন না। তাঁর বক্তব্যের পরিসর সমগ্র সৃষ্টিজগতকে ধারণ করে। মানুষের দৃষ্টিতে পৃথিবী হয়তো বিশাল, কিন্তু গীতার মহাজাগতিক দৃষ্টিতে মানুষ সমগ্র সৃষ্টির একটি অংশমাত্র।

এরপর কৃষ্ণ অর্জুনকে কৌন্তেয় বলে সম্বোধন করেন। কুন্তীর পুত্র হওয়ার কারণে অর্জুনের এই নাম। এই সম্বোধনের মধ্যে যেমন স্নেহ ও পরিচয়ের অনুভূতি রয়েছে, তেমনি একটি গভীর সাহিত্যিক তাৎপর্যও আছে। মহাবিশ্বের মতো বিরাট একটি তত্ত্ব ব্যাখ্যা করার সময় কৃষ্ণ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন নির্দিষ্ট মানুষকে তাঁর পারিবারিক পরিচয়ের মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। যেন তিনি বলতে চাইছেন, মহাজগতের যে নিয়ম তুমি এখন শুনছ, তার বাইরে তুমি নও। তোমার নিজের জীবনও সেই বৃহত্তর সৃষ্টিচক্রের অংশ।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর একটি হলো প্রকৃতি। প্রকৃতি শব্দটির মধ্যে প্র এবং √কৃ ধাতুর ভাব রয়েছে। √কৃ অর্থ করা, সৃষ্টি করা বা গঠন করা। সেই দৃষ্টিতে প্রকৃতি হলো সেই মূল সৃষ্টিশক্তি যার মাধ্যমে প্রকাশিত জগতের বহুরূপতা প্রকাশ পায়। তবে গীতায় প্রকৃতি বলতে শুধু পাহাড়, নদী, বৃক্ষ, প্রাণী বা দৃশ্যমান পরিবেশকে বোঝানো হয়নি। এখানে প্রকৃতি হলো মহাজাগতিক সৃষ্টির মূল শক্তি। এটি এমন এক শক্তি যার মাধ্যমে অব্যক্ত সম্ভাবনা ব্যক্ত জগতের রূপ লাভ করে। তাই প্রকৃতিকে শুধু Nature বা প্রাকৃতিক পরিবেশ হিসেবে অনুবাদ করলে গীতার দর্শনের সম্পূর্ণ গভীরতা ধরা পড়ে না।

কৃষ্ণ বলেন সর্বভূতানি প্রকৃতিং যান্তি। যান্তি শব্দটি এসেছে √যা ধাতু থেকে, যার অর্থ যাওয়া বা গমন করা। কিন্তু এখানে যাওয়া বলতে কোনো স্থান পরিবর্তন বোঝানো হয়নি। সমস্ত জীব কল্পের শেষে প্রকৃতিতে ফিরে যায়। অর্থাৎ তারা তাদের প্রকাশিত অবস্থাকে অতিক্রম করে প্রকৃতির অব্যক্ত অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করে। এই প্রত্যাবর্তনকে লয় বলা যায়। তবে লয় মানেই সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীনতা নয়। যেমন একটি গাছ শুকিয়ে গেলেও তার বীজে ভবিষ্যৎ গাছের সম্ভাবনা থাকতে পারে, তেমনি প্রকাশিত জগতের অবসানও একেবারে শূন্যতায় পতন নয়। এটি এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় প্রত্যাবর্তন।

মামিকাম্ শব্দটির মধ্যেও গভীর অর্থ রয়েছে। মম অর্থ আমার এবং মামিকাম্ অর্থ আমার সঙ্গে সম্পর্কিত বা আমার অধীন। কৃষ্ণ যখন প্রকৃতিকে আমার প্রকৃতি বলছেন, তখন তিনি প্রকৃতিকে ঈশ্বর থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন কোনো শক্তি হিসেবে দেখাচ্ছেন না। প্রকৃতি ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ঈশ্বরের অধীন একটি মহাশক্তি। এই ধারণাটি গীতার ঈশ্বরতত্ত্ব বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতি জগতকে প্রকাশ করে, কিন্তু সেই প্রকৃতিরও একটি গভীর ঈশ্বরীয় ভিত্তি রয়েছে।

এরপর আসে কল্পক্ষয়ে শব্দটি। কল্প হলো এক বিশাল মহাজাগতিক সময়চক্র এবং ক্ষয় অর্থ অবসান বা বিলয়। কল্পক্ষয়ে অর্থাৎ কল্পের অবসানে সমস্ত প্রকাশিত জীব প্রকৃতিতে প্রত্যাবর্তন করে। এখানে গীতার সময়ের ধারণা আধুনিক মানুষের দৈনন্দিন সময়বোধ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষ সাধারণত সময়কে অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলা একটি সরল রেখা হিসেবে দেখে। কিন্তু ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যে সময়কে অনেক সময় চক্রাকার হিসেবেও দেখা হয়। সৃষ্টি হয়, স্থিতি থাকে, লয় ঘটে এবং আবার সৃষ্টি প্রকাশিত হয়। তাই সমাপ্তির মধ্যেই নতুন সূচনার সম্ভাবনা নিহিত থাকে।

এই ভাবটিই আরও স্পষ্ট হয় পুনস্তানি কল্পাদৌ বিসৃজাম্যহম্ অংশে। পুনঃ অর্থ আবার এবং তানি অর্থ তাদের। কল্পাদৌ অর্থ কল্পের শুরুতে। বিসৃজামি শব্দটি এসেছে বি এবং √সৃজ্ থেকে। √সৃজ্ অর্থ ছেড়ে দেওয়া, প্রবাহিত করা, প্রকাশ করা বা সৃষ্টি করা। তাই বিসৃজামি অর্থ আমি পুনরায় প্রকাশ করি। কৃষ্ণ বলছেন, কল্পের শেষে সমস্ত জীব প্রকৃতিতে লীন হয় এবং কল্পের শুরুতে তিনি তাদের আবার প্রকাশ করেন। এখানে সৃষ্টি ও লয়কে দুটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, একই মহাজাগতিক চক্রের দুটি পরস্পর সম্পর্কিত পর্যায় হিসেবে দেখা হয়েছে।

এই জায়গাতেই শ্লোকটির অন্যতম গভীর দর্শন প্রকাশিত হয়। যা প্রকাশিত হয়েছে তা একদিন অপ্রকাশিত হতে পারে, কিন্তু অপ্রকাশ মানেই অস্তিত্বের সম্পূর্ণ বিলোপ নয়। একটি বীজের মধ্যে যেমন একটি সম্পূর্ণ বৃক্ষের সম্ভাবনা অদৃশ্য অবস্থায় থাকে, তেমনি প্রকৃতির অব্যক্ত অবস্থার মধ্যেও ভবিষ্যৎ প্রকাশের সম্ভাবনা নিহিত থাকে। তাই গীতার সৃষ্টি দর্শনকে শুধু শূন্য থেকে হঠাৎ কিছু সৃষ্টি হওয়ার ধারণা হিসেবে দেখলে এর সূক্ষ্মতা বোঝা যায় না। এখানে প্রকাশ এবং অপ্রকাশ, সৃষ্টি এবং লয়, ব্যক্ত এবং অব্যক্ত একটি বৃহত্তর চক্রের অংশ।

সাংখ্য দর্শনের সঙ্গে এই প্রকৃতি ধারণার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি হলো জগতের মূল কারণ এবং পুরুষ হলো চৈতন্যস্বরূপ। প্রকৃতির মধ্যে সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ এই তিন গুণের কার্যকলাপের মাধ্যমে বহুরূপী জগতের প্রকাশ ঘটে। তবে গীতার দর্শন সাংখ্যের প্রকৃতি ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে। এখানে প্রকৃতি কোনো স্বাধীন সর্বোচ্চ সত্য নয়। কৃষ্ণ প্রকৃতিকে নিজের শক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। ফলে প্রকৃতি ও ঈশ্বরের সম্পর্ক গীতার তত্ত্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোককে আরও গভীরভাবে দেখা যায়। সেখানে পরম সত্য হলো ব্রহ্ম। জগতের নাম ও রূপ পরিবর্তনশীল। সৃষ্টি ও লয় মূল আত্মার প্রকৃত জন্ম বা মৃত্যু নয়। যেমন সমুদ্রের মধ্যে অসংখ্য ঢেউ ওঠে এবং আবার সমুদ্রেই মিলিয়ে যায়, তেমনি প্রকাশিত জগতের রূপ পরিবর্তিত হয়, কিন্তু তার গভীর অস্তিত্বগত ভিত্তি অন্য স্তরে অবস্থিত। এই দৃষ্টিতে সৃষ্টি ও লয় হলো নাম ও রূপের পরিবর্তন, পরম সত্যের পরিবর্তন নয়।

ভক্তি দর্শনে আবার এই শ্লোকের মধ্যে ঈশ্বরের সঙ্গে জীব ও প্রকৃতির সম্পর্ক আরও ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে। জীব ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং প্রকৃতিও ঈশ্বরের শক্তি। তাই কৃষ্ণের “আমি” শব্দটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে নিজের কথা বলছেন না। এখানে তাঁর “আমি” ঈশ্বরীয় সত্তার আত্মপ্রকাশ। মানুষ যখন বলে আমি, তখন সেই আমি সাধারণত ব্যক্তিগত পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা এবং অহংকারের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কিন্তু কৃষ্ণের “অহম্” সেই সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত অহংকারের আমি নয়। এটি সেই পরম সত্তার আমি যার অধীন প্রকৃতি এবং যার মাধ্যমে সৃষ্টি ও লয়ের মহাচক্র প্রকাশিত হয়।

এই শ্লোকের প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত গভীর। মানুষের জীবনেও ছোট ছোট কল্পের মতো অসংখ্য চক্র রয়েছে। শৈশব শেষ হয়ে কৈশোর আসে। কৈশোরের পর যৌবন আসে। জীবনের একটি পরিচয় শেষ হয়ে অন্য পরিচয় তৈরি হয়। একটি সম্পর্কের অবসান ঘটে এবং নতুন সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি হয়। একটি কাজ শেষ হয়ে নতুন কাজ শুরু হয়। একটি স্বপ্ন ভেঙে গিয়ে নতুন স্বপ্ন জন্ম নিতে পারে। এই অর্থে কল্পক্ষয়কে মানুষের জীবনের বিভিন্ন সমাপ্তির প্রতীক হিসেবে দেখা যায় এবং কল্পাদৌকে নতুন সূচনার প্রতীক হিসেবে বোঝা যায়।

মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও এই শ্লোকের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মনে চিন্তার জন্ম হয়, চিন্তা শক্তিশালী হয় এবং একসময় তা মিলিয়ে যায়। অভ্যাস তৈরি হয়, পরিবর্তিত হয় এবং কখনো বিলীন হয়। পুরোনো মানসিক কাঠামো ভেঙে নতুন মানসিক কাঠামো তৈরি হয়। অর্থাৎ মানুষের অন্তর্জগতেও সৃষ্টি ও লয়ের একটি নিরন্তর প্রবাহ রয়েছে। যে ব্যক্তি পরিবর্তনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস হিসেবে দেখে, তার মধ্যে ভয় জন্মায়। কিন্তু যে ব্যক্তি পরিবর্তনকে বৃহত্তর চক্রের অংশ হিসেবে দেখতে শেখে, তার মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা ও স্থিরতা তৈরি হতে পারে।

এই শ্লোক আমাদের অনিত্যতার শিক্ষাও দেয়। পৃথিবীর কোনো দৃশ্যমান রূপ চিরস্থায়ী নয়। শরীর পরিবর্তিত হয়। সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়। সমাজ পরিবর্তিত হয়। সভ্যতা পরিবর্তিত হয়। রাষ্ট্রের উত্থান ও পতন ঘটে। ইতিহাসের এক যুগ শেষ হয়ে অন্য যুগ শুরু হয়। কিন্তু পরিবর্তনের এই ধারার মধ্যেও একটি গভীর নিয়ম কাজ করছে। সেই নিয়ম হলো প্রকাশ এবং প্রত্যাবর্তন। তাই গীতার দৃষ্টিতে পরিবর্তনকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে তার প্রকৃতি বোঝা প্রয়োজন।

একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। সমুদ্র থেকে মেঘ তৈরি হয়। মেঘ থেকে বৃষ্টি নামে। বৃষ্টি নদী হয়ে আবার সমুদ্রের দিকে ফিরে যায়। জল কখনো মেঘের রূপে, কখনো বৃষ্টির রূপে, কখনো নদীর রূপে এবং কখনো সমুদ্রের রূপে প্রকাশিত হয়। রূপ বদলায়, কিন্তু প্রবাহ থামে না। এই উপমা গীতার মহাজাগতিক সৃষ্টি ও লয়ের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়, কিন্তু প্রকাশ এবং প্রত্যাবর্তনের ধারণাটি বোঝাতে সাহায্য করে।

মানুষের জীবনের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। আমরা প্রায়ই কোনো একটি অবস্থাকে স্থায়ী বলে ধরে নিই। মনে করি বর্তমান পরিস্থিতিই আমাদের সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিন্তু গীতার এই শ্লোক মনে করিয়ে দেয় যে পরিবর্তন অস্তিত্বের স্বাভাবিক নিয়ম। একটি অধ্যায়ের শেষ মানেই সমগ্র জীবনের শেষ নয়। একটি রূপের অবসান নতুন রূপের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তাই জীবনের পরিবর্তনের মধ্যে স্থিরতা খুঁজে নেওয়া এবং সমাপ্তির মধ্যেও নতুন সূচনার সম্ভাবনা উপলব্ধি করা গীতার এই শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক প্রয়োগ।

সবশেষে বলা যায়, “সর্বভূতানি কৌন্তেয় প্রকৃতিং যান্তি মামিকাম্” শুধু একটি মহাজাগতিক সৃষ্টি তত্ত্ব নয়। এটি অস্তিত্বের এক গভীর চক্রাকার দর্শন। সর্বভূতানি আমাদের সমস্ত জীব ও সৃষ্টির কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃতি আমাদের সেই মহাশক্তির কথা বলে যার মাধ্যমে জগত প্রকাশিত হয়। যান্তি আমাদের প্রত্যাবর্তনের কথা জানায়। কল্পক্ষয় আমাদের মহাজাগতিক সমাপ্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পুনঃ এবং কল্পাদৌ আমাদের নতুন সূচনার কথা বলে। আর বিসৃজাম্যহম্ আমাদের ঈশ্বরীয় সৃষ্টিশক্তির দিকে দৃষ্টি ফেরায়।

এই শ্লোকের গভীরতম শিক্ষা সম্ভবত এই যে সৃষ্টি ও লয় পরস্পরের শত্রু নয়। তারা একই মহাজাগতিক সত্যের দুই দিক। যা প্রকাশিত হয় তা একদিন অপ্রকাশিত হয় এবং যা অপ্রকাশিত হয় তা আবার প্রকাশিত হতে পারে। তাই সমাপ্তির মধ্যেও সম্ভাবনা আছে এবং পরিবর্তনের মধ্যেও ধারাবাহিকতা আছে। গীতার এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে শুধু মহাবিশ্বকে বোঝার শিক্ষা দেয় না। এটি নিজের জীবন, নিজের পরিবর্তন এবং নিজের অস্তিত্বকেও আরও গভীরভাবে দেখার শিক্ষা দেয়। এখানে জগতকে একটি স্থির বস্তু হিসেবে নয়, বরং ঈশ্বর, প্রকৃতি, কাল ও জীবের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে চলমান এক মহাচক্র হিসেবে দেখা হয়েছে। আর সেই মহাচক্রের অন্তর্নিহিত সত্য হলো প্রকাশের মধ্যেও ঈশ্বর, লয়ের মধ্যেও ঈশ্বর এবং পুনঃপ্রকাশের মধ্যেও সেই একই চিরন্তন সত্তার উপস্থিতি।

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 18, 2026 August 18, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি