শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯.৮ — প্রকৃতির বশে জীবের সৃষ্টি, ঈশ্বরের পুনঃপুনঃ সৃষ্টিতত্ত্ব ও প্রকৃতির শক্তি
প্রকৃতিং স্বামবষ্টভ্য বিসৃজানি পুনঃ পুনঃ।
ভূতগ্রামমিমং কৃৎস্নমবশং প্রকৃতের্বশাৎ।।৮।।
অনুবাদঃ এই জগৎ আমারই প্রকৃতির অধীন। তা প্রকৃতির বশে অবশ হয়ে আমার ইচ্ছার দ্বারা পুনঃ পুনঃ সৃষ্ট হয় এবং আমারই ইচ্ছায় অন্তকালে বিনষ্ট হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার নবম অধ্যায়ের অষ্টম শ্লোকটি সৃষ্টির রহস্য, প্রকৃতির শক্তি, জীবের সীমাবদ্ধতা এবং ঈশ্বরের সঙ্গে জগতের সম্পর্ককে অত্যন্ত গভীরভাবে প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, “প্রকৃতিং স্বামবষ্টভ্য বিসৃজামি পুনঃ পুনঃ। ভূতগ্রামমিমং কৃৎস্নমবশং প্রকৃতের্বশাৎ।” অর্থাৎ নিজের প্রকৃতিকে অবলম্বন করে আমি বারবার এই সমগ্র জীবসমষ্টিকে প্রকাশ করি, কারণ সমস্ত জীব প্রকৃতির বশে অবস্থান করে। এই শ্লোকের মধ্যে সৃষ্টির একটি চক্রাকার ধারণা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের স্বাধীনতা, প্রকৃতির প্রভাব এবং ঈশ্বরের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক বক্তব্য।
প্রথমেই আসে “প্রকৃতি” শব্দটি। সংস্কৃত প্রকৃতি শব্দটির সঙ্গে কৃ ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। কৃ ধাতুর অর্থ করা, সৃষ্টি করা, নির্মাণ করা বা কার্য সম্পাদন করা। প্র উপসর্গের মাধ্যমে শব্দটির মধ্যে একটি বিশেষ অর্থের বিকাশ ঘটে এবং প্রকৃতি বলতে বোঝায় সেই মৌলিক শক্তি যার মাধ্যমে কোনো কিছু প্রকাশিত বা গঠিত হয়। গীতার প্রেক্ষাপটে প্রকৃতি কেবল আমাদের চারপাশের গাছপালা, নদী, পাহাড়, মাটি বা দৃশ্যমান জগত নয়। প্রকৃতি হলো সেই বৃহৎ কার্যশক্তি যার মাধ্যমে অব্যক্ত সম্ভাবনা ব্যক্ত জগতে প্রকাশিত হয়। মানুষের শরীর, ইন্দ্রিয়, মন এবং জগতের পরিবর্তনশীল প্রকাশ এই প্রকৃতির কার্যক্ষেত্রের অন্তর্গত।
শ্রীকৃষ্ণ এখানে শুধু প্রকৃতি বলেননি। তিনি বলেছেন “প্রকৃতিং স্বাম্”। স্বাম্ শব্দের অর্থ নিজের বা নিজস্ব। এই একটি শব্দই ঈশ্বর এবং প্রকৃতির সম্পর্ক সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা প্রকাশ করে। প্রকৃতি ঈশ্বরের বাইরে স্বাধীন কোনো সর্বোচ্চ শক্তি নয়। গীতার দৃষ্টিতে প্রকৃতি ঈশ্বরের শক্তি এবং তাঁর অধীন। ঈশ্বর প্রকৃতির দ্বারা পরিচালিত নন। বরং নিজের প্রকৃতিকে অবলম্বন করেই তিনি জগতের প্রকাশ ঘটান। এই কারণে শ্লোকটির শুরুতেই ঈশ্বর এবং প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে যায়।
এরপর এসেছে “অবষ্টভ্য” শব্দটি। এর মধ্যে অবলম্বন করা, ধরে রাখা, আশ্রয় করা এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার ভাব রয়েছে। তাই “প্রকৃতিং স্বামবষ্টভ্য” বলতে বোঝায় নিজের প্রকৃতিকে অবলম্বন করে বা নিজের প্রকৃতিশক্তিকে আশ্রয় করে। এখানে একটি সূক্ষ্ম দার্শনিক বিষয় রয়েছে। কৃষ্ণ প্রকৃতির অধীন হয়ে সৃষ্টি করছেন না। বরং প্রকৃতিকে নিজের শক্তি হিসেবে অবলম্বন করে সৃষ্টি করছেন। অর্থাৎ প্রকৃতি হলো কার্যকরী শক্তি এবং ঈশ্বর হলেন সেই শক্তির সর্বোচ্চ নিয়ামক।
“বিসৃজামি” শব্দটি এসেছে সৃজ ধাতু থেকে। সৃজের মধ্যে সৃষ্টি করা, প্রকাশ করা, নির্গত করা এবং ছেড়ে দেওয়ার ভাব রয়েছে। এর সঙ্গে বি উপসর্গ যুক্ত হয়ে বিসৃজ শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। “বিসৃজামি” অর্থ আমি প্রকাশ করি, আমি সৃষ্টি করি বা আমি নির্গত করি। এখানে সৃষ্টি বলতে একেবারে শূন্য থেকে কোনো বস্তু তৈরি করার ধারণাই শুধু বোঝায় না। এর মধ্যে অব্যক্ত অবস্থা থেকে ব্যক্ত অবস্থায় প্রকাশিত হওয়ার ভাবও রয়েছে। ফলে গীতার সৃষ্টি তত্ত্বকে কেবল কোনো কারিগরি নির্মাণের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। এটি অনেক বেশি গভীর একটি প্রকাশ প্রক্রিয়া।
এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন “পুনঃ পুনঃ”। অর্থাৎ বারবার। এই পুনরুক্তি শ্লোকটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতীয় দর্শনের বিশ্বদৃষ্টিতে সৃষ্টি একটি মাত্র ঘটনার নাম নয়। জগত প্রকাশিত হয়, স্থিত থাকে, আবার লয়ে যায় এবং পুনরায় প্রকাশিত হয়। এইভাবে সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয়ের একটি চক্র অব্যাহত থাকে। দিন যেমন রাতের পরে আসে এবং রাত আবার দিনের পরে আসে, তেমনি মহাজগতের প্রকাশ ও লয়েরও একটি বৃহৎ চক্র রয়েছে। “পুনঃ পুনঃ” শব্দটি সেই চক্রাকার বিশ্বপ্রক্রিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে।
এরপর এসেছে “ভূতগ্রাম” শব্দটি। ভূত শব্দটি এসেছে ভূ ধাতু থেকে, যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা উৎপন্ন হওয়া। সেই অর্থে ভূত হলো যা অস্তিত্ব লাভ করেছে। গ্রাম শব্দের অর্থ সমষ্টি বা গুচ্ছ। তাই ভূতগ্রাম বলতে বোঝায় জীবসমষ্টি বা সমস্ত সৃষ্ট জীবের সমষ্টি। কৃষ্ণ যখন বলেন “ভূতগ্রামমিমং কৃৎস্নম্”, তখন তিনি কোনো একটি জাতি, প্রাণী বা মানবগোষ্ঠীর কথা বলছেন না। তিনি সমগ্র জীবজগতের কথা বলছেন। দৃশ্যমান এবং অদৃশ্যমান অসংখ্য জীব এই বৃহৎ সৃষ্টিচক্রের অংশ।
এইখানেই আসে “অবশ” শব্দটি। অবশ শব্দের অর্থ নিজের সম্পূর্ণ বশে নয় বা অন্য কোনো শক্তির অধীন। গীতার এই শব্দটি মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত গভীর একটি সত্য প্রকাশ করে। মানুষ নিজেকে স্বাধীন মনে করে। সে মনে করে তার চিন্তা, ইচ্ছা এবং কাজ সবই তার নিজের সিদ্ধান্তের ফল। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় মানুষের সিদ্ধান্তকে তার শরীর, মন, প্রবৃত্তি, অভ্যাস, পরিবেশ, সংস্কার এবং মানসিক প্রবণতা গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সে অনেক সময় এমন কাজও করে যা সে জানে তার জন্য ভালো নয়। সে রাগ করতে চায় না কিন্তু রাগ করে। কোনো অভ্যাস ত্যাগ করতে চায় কিন্তু বারবার সেই অভ্যাসের কাছে ফিরে যায়। কোনো বিষয় থেকে দূরে থাকতে চায় কিন্তু নিজের আকর্ষণ ও প্রবৃত্তির কাছে পরাজিত হয়। গীতার ভাষায় এই অবস্থার একটি গভীর ব্যাখ্যা হলো “অবশং প্রকৃতের্বশাৎ”।
“প্রকৃতের্বশাৎ” অর্থ প্রকৃতির বশে থাকার কারণে। প্রকৃতি মানুষের বাহ্যিক পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের দেহ, ইন্দ্রিয়, মন এবং বিভিন্ন প্রবণতাও প্রকৃতির কার্যক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত। ফলে সাধারণ জীব প্রকৃতির নানা শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই কারণেই মানুষের স্বাধীনতা আপেক্ষিক। সে সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। আবার সম্পূর্ণ অসহায়ও নয়। গীতার সমগ্র সাধনামার্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো মানুষকে এই প্রকৃতিনির্ভর অবস্থার সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং তাকে আত্মজ্ঞান ও আত্মসংযমের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে শ্লোকটি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা সম্পর্কে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। মানুষ কি সত্যিই সম্পূর্ণ স্বাধীন। আমার যে চিন্তা আজ মনে জন্ম নিল, সেটি কি সম্পূর্ণ আমার নিজের সৃষ্টি। আমার যে রাগ, আকাঙ্ক্ষা, ভয় বা আসক্তি তৈরি হলো, তার ওপর কি আমার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আমার অভ্যাসগুলো কোথা থেকে এলো। আমার সিদ্ধান্তগুলো কতটা আমার সচেতন বিবেচনার ফল এবং কতটা পূর্ব অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত। গীতার দৃষ্টিতে সাধারণ জীবের অবস্থা বুঝতে গেলে এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিকে না চিনলে মানুষ নিজের স্বাধীনতার সীমাও বুঝতে পারে না।
তবে এই শ্লোককে কোনোভাবেই এমনভাবে বোঝা উচিত নয় যে মানুষ সম্পূর্ণ ভাগ্যের হাতে বন্দী এবং তার নিজের কোনো সাধনা বা পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই। গীতার শিক্ষা বরং তার বিপরীত। মানুষ প্রকৃতির দ্বারা প্রভাবিত হয়, কিন্তু আত্মসচেতনতার মাধ্যমে সে নিজের প্রকৃতিকে চিনতে পারে। নিজের রাগকে দেখা, নিজের আসক্তিকে দেখা, নিজের অহংকারকে দেখা এবং নিজের মানসিক প্রবণতাকে বুঝতে শেখাই আত্মজিজ্ঞাসার শুরু। যে ব্যক্তি নিজের প্রকৃতির কার্যপ্রবাহকে চিনতে পারে, সে ধীরে ধীরে তার দ্বারা অন্ধভাবে পরিচালিত হওয়ার পরিবর্তে সচেতনভাবে জীবন পরিচালনা করতে শেখে।
সাংখ্য দর্শনের সঙ্গে এই শ্লোকের সম্পর্কও গভীর। সাংখ্য দর্শনে প্রকৃতি পরিবর্তনশীল জগতের মূল কার্যকারণ শক্তি এবং পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ সাক্ষী। গীতা সাংখ্যের ভাষা গ্রহণ করলেও সেখানে ঈশ্বরের ভূমিকা আরও কেন্দ্রীয়। এখানে কৃষ্ণ নিজেকে প্রকৃতির অধীন কোনো সত্তা হিসেবে দেখাচ্ছেন না। তিনি নিজের প্রকৃতিকে অবলম্বন করে সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ প্রকৃতি কার্যকরী শক্তি হলেও তার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন বেদান্ত দর্শনে এই সম্পর্কের ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। জীবের অভিজ্ঞ জগৎ প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এবং ঈশ্বর সেই সমগ্র ব্যবস্থার সর্বোচ্চ সত্য।
এই শ্লোককে আধুনিক মানুষের জীবনেও অত্যন্ত অর্থপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা যায়। আজ মানুষ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে। সে প্রকৃতির অনেক রহস্য উন্মোচন করেছে। মহাকাশে পৌঁছেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছে, অসংখ্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নির্মাণ করেছে। কিন্তু নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করা এখনও তার জন্য কঠিন। একজন মানুষ জানে অতিরিক্ত রাগ তার সম্পর্ক নষ্ট করে, তবু রাগ করে। সে জানে কোনো একটি অভ্যাস তার ক্ষতি করছে, তবু সেই অভ্যাস পুনরাবৃত্তি করে। সে জানে অতিরিক্ত আসক্তি তাকে দুর্বল করে, তবু আসক্তির কাছে ফিরে যায়। এই বাস্তবতা দেখায় যে বাহ্যিক জগতের ওপর কর্তৃত্ব অর্জন করা এবং নিজের অন্তর্জগতের ওপর কর্তৃত্ব অর্জন করা এক বিষয় নয়।
একটি নদীতে চলা নৌকার উপমা এখানে খুব সুন্দরভাবে প্রযোজ্য। নদীর স্রোত হলো প্রকৃতির শক্তি। নৌকা হলো মানুষের দেহ ও মন। আর মাঝির সচেতনতা হলো তার বিবেক ও আত্মসচেতনতা। যে মাঝি স্রোতকে অস্বীকার করে, সে স্রোতের হাতে ভেসে যায়। কিন্তু যে মাঝি স্রোতের প্রকৃতি বোঝে, সে নিজের নৌকার দিক সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। একইভাবে মানুষ প্রকৃতির অস্তিত্ব অস্বীকার করে স্বাধীন হতে পারে না। বরং নিজের প্রকৃতিকে বুঝে, তার প্রবণতাকে চিনে এবং সচেতনভাবে জীবন পরিচালনা করার মধ্যেই তার প্রকৃত উন্নতি।
“পুনঃ পুনঃ” শব্দটির মধ্যে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কেও একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। মানুষ একই ভুল বারবার করে। একই ধরনের আকর্ষণে আটকে যায়। একই ধরনের আবেগে আক্রান্ত হয়। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু আত্মজ্ঞান তাকে এই পুনরাবৃত্তির চক্র দেখতে শেখায়। যখন সে নিজের আচরণের কারণ বুঝতে শুরু করে, তখন পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই অর্থে গীতার মহাজাগতিক সৃষ্টি চক্র এবং মানুষের মানসিক পুনরাবৃত্তির মধ্যে একটি প্রতীকী সাদৃশ্য দেখা যায়।
এই শ্লোকের সাহিত্যিক সৌন্দর্যও বিশেষভাবে লক্ষণীয়। “বিসৃজামি পুনঃ পুনঃ” একদিকে ঈশ্বরের অবিরাম সৃষ্টিশক্তির কথা বলে এবং “অবশং প্রকৃতের্বশাৎ” অন্যদিকে জীবের সীমাবদ্ধতার কথা প্রকাশ করে। একদিকে আছে ঈশ্বরের স্বাধীন কার্যক্ষমতা, অন্যদিকে আছে প্রকৃতির অধীন জীবের অবস্থা। এই দুই বিপরীত অবস্থান পাশাপাশি স্থাপন করার মধ্যেই শ্লোকটির গভীর দার্শনিক শক্তি নিহিত।
আধ্যাত্মিক অর্থে এই শ্লোক আমাদের নিজের অস্তিত্বের দিকে তাকাতে শেখায়। আমরা নিজেদেরকে সাধারণত শরীর, মন, পরিচয়, সম্পর্ক এবং সামাজিক অবস্থানের মাধ্যমে চিনে থাকি। কিন্তু গীতা প্রশ্ন করে, এর গভীরে যে চৈতন্য আছে তার প্রকৃতি কী। যদি মানুষ কেবল প্রকৃতির পরিবর্তনশীল উপাদান হয়, তাহলে তার চেতনা ও আত্মসচেতনতার রহস্য কোথায়। আর যদি সে নিজের প্রকৃতিকে প্রত্যক্ষ করতে পারে, তাহলে প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্কও নতুনভাবে বোঝা সম্ভব। এখানেই গীতার আত্মজ্ঞান ধারণার সূচনা।
শ্রীকৃষ্ণের বক্তব্যের মধ্যে তাই শুধু সৃষ্টিতত্ত্ব নেই। এখানে মানুষের মুক্তির সম্ভাবনাও নিহিত আছে। প্রকৃতি মানুষকে পরিচালনা করে এই সত্যটি উপলব্ধি করা আত্মজ্ঞানকে অসম্ভব করে না। বরং আত্মজ্ঞান শুরু হয় যখন মানুষ উপলব্ধি করে যে সে নিজের মন ও প্রবৃত্তির প্রতিটি আন্দোলনের সঙ্গে একাকার নয়। সে নিজের চিন্তাকে দেখতে পারে, নিজের আবেগকে দেখতে পারে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে চিনতে পারে। যে দেখতে পারে, তার মধ্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও থাকে।
সুতরাং “প্রকৃতিং স্বামবষ্টভ্য বিসৃজামি পুনঃ পুনঃ” শুধু একটি মহাজাগতিক সৃষ্টিতত্ত্ব নয়। এটি ঈশ্বর, প্রকৃতি এবং জীবের সম্পর্কের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অসাধারণ দার্শনিক প্রকাশ। প্রকৃতি হলো প্রকাশের শক্তি, কৃষ্ণ সেই শক্তির সর্বোচ্চ নিয়ামক এবং জীব সেই প্রকৃতির কার্যপ্রবাহের মধ্যে অবস্থানকারী সত্তা। জীব নিজের স্বাধীনতাকে যতটা সম্পূর্ণ মনে করে, বাস্তবে সে ততটা স্বাধীন নয়। তার দেহ, মন, প্রবৃত্তি এবং সংস্কার তাকে প্রভাবিত করে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার জ্ঞানই আত্মসচেতনতার প্রথম ধাপ।
শেষ পর্যন্ত এই শ্লোক আমাদের একটি গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। আমরা কি কেবল প্রকৃতির স্রোতে ভেসে চলা জীব, নাকি প্রকৃতির কার্যপ্রবাহকে প্রত্যক্ষ করে তার গভীরতর সত্য উপলব্ধি করার ক্ষমতাও আমাদের মধ্যে রয়েছে। গীতার উত্তর হলো মানুষের মধ্যে সেই সম্ভাবনা রয়েছে। তাই প্রকৃতির বশে জন্ম নেওয়া মানুষের প্রকৃত যাত্রা হলো নিজের প্রকৃতিকে জানা, নিজের সীমাবদ্ধতাকে বোঝা, নিজের চেতনাকে জাগ্রত করা এবং পরম সত্যের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক উপলব্ধি করা। এই কারণেই গীতা ৯.৮ এর এই শ্লোক কেবল বিশ্বসৃষ্টির কথা বলে না। এটি মানুষের নিজের অন্তর্জগতের সৃষ্টিচক্র, অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি, স্বাধীনতার সীমা এবং আত্মমুক্তির সম্ভাবনার কথাও বলে।
এই শ্লোকের সারকথা হলো, জগতের প্রকাশ প্রকৃতির মাধ্যমে বারবার ঘটে এবং জীব প্রকৃতির নানা শক্তির অধীন হয়ে সেই প্রকাশের মধ্যে অবস্থান করে। কিন্তু মানুষের মহত্ত্ব এখানেই যে সে নিজের এই অবস্থাকে উপলব্ধি করতে পারে। প্রকৃতির বশে থাকা থেকে প্রকৃতিকে জানা এবং প্রকৃতিকে জানা থেকে আত্মসত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়াই গীতার আধ্যাত্মিক যাত্রার অন্যতম গভীর পথ।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!