সিডনি হামলার নেপথ্যে পেট্রো-ডলার? র্যাডিকাল ন্যারেটিভের জাল
গত রোববার অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বন্ডাই সৈকতে বন্দুক হামলায় অন্তত ১৫ জন প্রাণ হারান। বন্দুকধারীদের মধ্যে নাভিদের বাবা সাজিদ আকরামও নিহত হয়েছেন। যিনি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা, হত্যা, হত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর জখম করা, বিস্ফোরক স্থাপন এবং গুরুতর শারীরিক ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাজিদ ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। তবে হায়দরাবাদে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন শেষে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত এক নারীকে বিয়ে করে ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান।
সিডনিতে হামলার এক মাস আগে ফিলিপাইন সফর করেন সাজিদ ও নাভিদ। অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সামরিক ধাঁচের প্রশিক্ষণ নিতে তারা ফিলিপাইনে গিয়েছিলেন। ওই সময় সাজিদ ভারতীয় এবং নাভিদ অস্ট্রেলীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ মঙ্গলবার বলেন, হামলাকারীরা ‘ইসলামিক স্টেটের আদর্শ’ দ্বারা প্ররোচিত হয়ে হামলা করে।
বিশ্লেষন করলে দেখা যায় সিডনিতে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর সন্ত্রাসবাদী হামলার পিছনেও একই শক্তি। যা আমাদের সামনে কিছু পুরনো ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসেছে। বারবার একই ধরণের আদর্শ, একই ধরণের নেটওয়ার্ক, এবং আশ্চর্যজনকভাবে একই রকম ভূ-রাজনৈতিক সংযোগ । যা পাকিস্তানি লিংক, জিহাদি মতাদর্শ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রবাহ এই ত্রিভুজ সম্পর্ক। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বহুদিন ধরে তাদের এই রকম আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকা পাশ্চাত্য মিলে ওগাল্ফ দেশগুলোকে পেট্রো-ডলারের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যকে শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, আদর্শিকভাবেও পুনর্গঠন করেছে। তেলের বিনিময়ে ডলার, ডলারের বিনিময়ে অস্ত্র, আর অস্ত্র ও অর্থের ছায়ায় নির্দিষ্ট এক ধরনের ধর্মীয় গোষ্ঠী ও ব্যাখ্যার বিস্তার। এই প্রক্রিয়াই ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান এবং পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে র্যাডিকালাইজেশনের বীজ বপন করেছে।
পাকিস্তানকে একটি ফ্রন্টলাইন রাষ্ট্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধের নামে, কখনো সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে । আবার কখনো ইসলামের প্রকৃত প্রচারক হিসেবে পরিচিত করানো। কিন্তু এর ফল ভোগ করেছে সাধারণ মানুষ, দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ এবং বিশ্ব নিরাপত্তা। এই র্যাডিকালাইজেশন শুধু মাদ্রাসা বা অস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি সংস্কৃতি, মিডিয়া এবং বিনোদন জগতেও ঢুকে পড়েছে।
আজ আমরা আলোচনা করবো পেট্রো-ডলারের আরেকটি কম আলোচিত প্রভাব বলিউড। কীভাবে অর্থায়ন, প্রযোজনা, গল্প নির্বাচন এবং চরিত্র নির্মাণের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক ন্যারেটিভ ধীরে ধীরে মূলধারার সিনেমায় ঢুকে গেছে। এটি কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়। এটি অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্কের একটি বাস্তব বিশ্লেষণ।
পরিকল্পিতভাবে সমাজ পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রভাব
আমরা সাধারণত ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে যেটা বুঝি, তা হলো সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল বা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি। এগুলো দৃশ্যমান জিনিস তৈরি করে রাস্তা, ব্রিজ, মেশিন, সফটওয়্যার। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার মাধ্যমে আমরা এই ধারণাগুলোই বেশি শুনে এসেছি। কিন্তু বাস্তবে ইঞ্জিনিয়ারিং শুধু কংক্রিট, লোহা বা কোডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এমন কিছু রূপ আছে, যেগুলো মানুষের চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু প্রভাব ফেলে অনেক গভীরে। ঠিক সেখানেই আসে সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং।
সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং হলো এমন একটি কৌশল বা পরিকল্পিত প্রক্রিয়া। যার মাধ্যমে একটি সমাজ, একটি জাতি বা একটি রাষ্ট্রের মানুষের আচরণ, চিন্তাধারা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, মানসিক গঠন এবং সামাজিক অভ্যাসকে ধীরে ধীরে পরিবর্তন করা হয়। এটি কোনো হঠাৎ পরিবর্তন নয়, বরং অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। এখানে মানুষের ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয় না। বরং এমনভাবে পরিবেশ, শিক্ষা, মিডিয়া, সংস্কৃতি ও সামাজিক ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়, যাতে মানুষ নিজের অজান্তেই বদলে যেতে শুরু করে।
এই প্রক্রিয়ায় মানুষের বিহেভিয়ারাল প্যাটার্ন বদলানো হয় সে কীভাবে চিন্তা করবে, কীকে স্বাভাবিক মনে করবে, কী নিয়ে প্রশ্ন করবে আর কী নিয়ে নীরব থাকবে। ধীরে ধীরে তার আচার-আচরণ, সামাজিক সম্পর্ক, নৈতিক মানদণ্ড এমনকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সে কী শেখাবে, সেটাও প্রভাবিত হয়। এভাবেই একটি পুরো সমাজের চরিত্র বদলে যেতে পারে।
খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি এক মাস বা এক বছরের প্রজেক্টও না। এটি বহু বছরের, কখনো কখনো কয়েক দশকের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এর জন্য লাগে ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক শক্তি, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উপস্থিতি। শিক্ষা ব্যবস্থা, বিনোদন জগৎ, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান সবকিছুই এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে।
সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং বুঝতে পারলে আমরা অনেক সামাজিক পরিবর্তনকে নতুন চোখে দেখতে পারি। তখন বোঝা যায়, অনেক কিছুই স্বাভাবিক পরিবর্তন নয়, বরং পরিকল্পিত ও কৌশলগত রূপান্তরের ফল। আর এই বোঝাপড়াই আমাদের সচেতন হওয়ার প্রথম ধাপ।
শিক্ষা ও বিনোদন সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দুই স্তম্ভ দীর্ঘমেয়াদি সমাজ পরিবর্তনের কৌশলের ফাদে জাতি?
সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং মূলত দুটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথমটি হলো এডুকেশন সিস্টেম, আর দ্বিতীয়টি হলো এন্টারটেইনমেন্ট। এই দুই মাধ্যম ব্যবহার করেই দীর্ঘ সময় ধরে একটি সমাজের চিন্তাধারা, মূল্যবোধ এবং নৈতিক বোধকে ধীরে ধীরে রূপ দেওয়া হয়।
প্রথমে এডুকেশন সিস্টেমের কথা বলি। শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু তথ্য শেখায় না, বরং মানুষকে কীভাবে ভাবতে হবে, কাকে আদর্শ হিসেবে দেখতে হবে। কোন ইতিহাসকে গৌরব হিসেবে মানতে হবে এই সবকিছু নির্ধারণ করে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের অঞ্চলে, বিশেষ করে এনসিইআরটি (National Council of Educational Research and Training) সিলেবাসে এমন কিছু ন্যারেটিভ প্রাধান্য পেয়েছে। যেগুলো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। অনেকের মতে, লেফটিস্ট মিডিয়া ও তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের ছত্রছায়ায় এই পাঠ্যবইগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল। যাতে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট অংশকে রোমান্টিসাইজ করা হয়, আর অন্য অংশকে আড়াল বা নরম করে দেখানো হয়।
ফলাফল কী হয়েছে? আজ আমাদের অবচেতন মনে এমন ধারণা গেঁথে গেছে যে ভালো শাসক বলতে আকবরের মতো হতে হবে। অথচ ইতিহাসের আরেক দিক হলো এই শাসকদের আমলে ব্যাপক হত্যা, লুটপাট এবং দমন-পীড়নের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে সেই দিকগুলো খুব কমই গুরুত্ব পেয়েছে। একইভাবে, প্রেম ও ভালোবাসার আদর্শ হিসেবে আমাদের শেখানো হয়েছে শাহজাহানের গল্প তাজমহলের প্রেম। অথচ তার শাসনামলের নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা ও ক্ষমতার রাজনীতির আলোচনা তুলনামূলকভাবে চাপা পড়ে গেছে।
এরপর আসে দ্বিতীয় স্তম্ভ এন্টারটেইনমেন্ট। সিনেমা, সিরিয়াল, গান, নাচ এই বিনোদনের জগৎ মানুষের আবেগকে সবচেয়ে দ্রুত ও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এন্টারটেইনমেন্টের মাধ্যমে কোনো চরিত্রকে নায়ক বানানো যায়, আবার ইতিহাসের বিতর্কিত ব্যক্তিত্বকেও মহান হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। বারবার একই ধরণের গল্প, সংলাপ ও চিত্র দেখিয়ে মানুষের মনে একটি নির্দিষ্ট ভাবনা “নরমাল” করে দেওয়া হয়।
এডুকেশন সিস্টেম যুক্তি দিয়ে মন তৈরি করে, আর এন্টারটেইনমেন্ট আবেগ দিয়ে মন গড়ে তোলে। এই দুইয়ের সমন্বয়েই সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর এই প্রক্রিয়া একদিনে নয় দশক ধরে চলতে থাকে, যতক্ষণ না একটি পুরো প্রজন্ম সেটাকেই সত্য বলে মেনে নিতে শুরু করে।
শিক্ষা, জনসভা ও সিনেমার সমন্বয়ে সমাজ গঠনের অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন
ভালো দিক হলো, বহু বছর পরে এসে এখন এনসিআরটি সিলেবাসে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যে ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চা একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপিত হচ্ছিল, সেখান থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার একটি চেষ্টা আমরা দেখতে পাচ্ছি। এখন শিক্ষার মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, যারা সমাজ ও সভ্যতার নির্মাতা ছিলেন তাদের সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে আমাদের প্রাচীন ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, যোগব্যায়াম, আয়ুর্বেদিক জ্ঞান এই বিষয়গুলো নতুন করে পাঠ্যক্রমে গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিকড়, পরিচয় ও সভ্যতার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে আরও সচেতন হতে পারবে।
এই বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয় যে শিক্ষা ব্যবস্থা নিজেই একটি শক্তিশালী সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যম। কী পড়ানো হবে, কী বাদ দেওয়া হবে, কোন বিষয়কে গৌরব হিসেবে দেখানো হবে আর কোনটিকে প্রশ্নের বাইরে রাখা হবে। এই সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে একটি প্রজন্মের চিন্তাধারা তৈরি হয়। তাই এডুকেশন মিডিয়াম কখনোই নিরপেক্ষ থাকে না। এটি সবসময়ই কোনো না কোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বহন করে।
কিন্তু সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং শুধু শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো মিটিং, মিছিল, জনসভা এবং গণসমাবেশ। বছরের পর বছর, মাসের পর মাস, একই ভাষা, একই স্লোগান। একই আবেগ বারবার মানুষের সামনে তুলে ধরা হলে একটি পুরো জাতিকে ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এই প্রক্রিয়ায় একটি জাতিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়, আবার প্রয়োজনে একই কৌশল ব্যবহার করে একটি জাতিকে জাগিয়েও তোলা যায়। ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে।
এখন আসা যাক এন্টারটেইনমেন্টের কথায়, বিশেষ করে বলিউডের ভূমিকায়। বহুদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে যে বলিউডের একটি নির্দিষ্ট অংশ, বিশেষ করে কিছু প্রভাবশালী ইউনিয়ন লিডার ও মতাদর্শগত গোষ্ঠী, সিনেমার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করেছে। অনেক ছবিতে একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে বারবার ভিক্টিম বা অত্যাচারিত হিসেবে দেখানো হয়েছে। আর অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের চরিত্রগুলোকে নেগেটিভ বা ভিলেনের ভূমিকায় উপস্থাপন করা হয়েছে। বারবার এই চিত্র দেখানো হলে দর্শকের অবচেতন মনে সেটাই স্বাভাবিক সত্য হিসেবে গেঁথে যায়।
এই পুরো প্রক্রিয়াই সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং যেখানে শিক্ষা, জনসমাবেশ এবং বিনোদন একসঙ্গে কাজ করে । একটি সমাজের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে। আর এই বাস্তবতা বোঝাই হলো সচেতন নাগরিক হওয়ার প্রথম ধাপ।
ক্রাইম, প্রতিশোধ ও রাষ্ট্রব্যর্থতায় পেট্রো-ডলার থেকে পর্দার চরিত্র বলিউডের অবচেতন প্রভাব
এবার আমরা বলিউডের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের দিকে তাকাবো। বিশেষ করে ১৯৭০ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বলিউডে যে ধরনের সিনেমা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল, তার পেছনে ছিলেন দুইজন অত্যন্ত প্রভাবশালী স্ক্রিপ্ট রাইটার। এই জুটি পরিচিত ছিল সলিম,জাভেদ নামে। একজন হলেন জাভেদ আখতার বর্তমানে যিনি একজন পরিচিত কবি ও গীতিকার এবং ফারহান আখতারের বাবা। অন্যজন হলেন সলিম খান যিনি বলিউড অভিনেতা সালমান খানের বাবা। এই দুইজন একসঙ্গে প্রায় ২৪–২৫টি সফল সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, যা সেই সময়ের বলিউডের ধারা বদলে দেয়।
তাদের লেখা সিনেমাগুলোর মূল থিম ছিল ক্রাইম, আন্ডারওয়ার্ল্ড, প্রতিশোধ, রাগে ফুঁসে ওঠা নায়ক এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতা। “অ্যাংরি ইয়াং ম্যান” ইমেজটা এই সময়েই জনপ্রিয় হয়। এই গল্পগুলো শুধু বিনোদনই দেয়নি, বরং সমাজ সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি করেছে যেখানে আইন ব্যর্থ, আর অপরাধী জগৎ যেন বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের তখনকার সময়টাকেও মাথায় রাখতে হবে। সেই সময় বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা ও অভিযোগ শোনা যেত। বিশেষ করে দাউদ ইব্রাহিমের নাম বহুবার উঠে এসেছে বলিউডে অর্থায়ন, এক্সটরশন এবং প্রযোজনা সংক্রান্ত নানা ঘটনার সঙ্গে তার যোগসূত্র থাকার কথা বিভিন্ন অনুসন্ধান ও সাংবাদিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে সবকিছু আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, এবং এই প্রভাব বলিউডের পরিবেশে একটি বাস্তব ভয়ের আবহ তৈরি করেছিল।
আর এখানেই আসে অর্থের প্রশ্ন। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই সময় মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে দুবাই থেকে আসা অবৈধ অর্থ। যাকে অনেকেই “হোয়াইট ওয়াশড মানি” বা পেট্রো-ডলারের ছায়া অর্থ বলে উল্লেখ করেন বলিউডে প্রবেশ করছিল। বলা হয়, এই অর্থের একটি অংশ আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাধ্যমে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে লগ্নি হতো। এর ফলে শুধু সিনেমার বিষয়বস্তু নয়, নায়ক-ভিলেনের চরিত্র নির্মাণ, অপরাধকে গ্ল্যামারাইজ করা এবং সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে দেখানোর প্রবণতাও বাড়তে থাকে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি যদি সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দৃষ্টিতে দেখা যায়, তাহলে বোঝা যায় এটা শুধু গল্প বলা নয়। এটি ছিল মানুষের মানসিকতাকে ধীরে ধীরে এমনভাবে গড়ে তোলা, যেখানে অপরাধ, আন্ডারওয়ার্ল্ড এবং রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থা “নরমাল” বলে মনে হতে শুরু করে। আর বলিউডের মতো শক্তিশালী মাধ্যমের মাধ্যমে এই প্রভাব বহু প্রজন্মের মনে গেঁথে গেছে।
বলিউডে শ্রেণি ও পরিচয়ের চিত্রায়ন ও সিনেমার মাধ্যমে সমাজের মানুষের মানুষিক গঠন প্রভাব
এবার আমরা সলিম খান ও জাভেদ আখতার এই বিখ্যাত স্ক্রিপ্টরাইটার জুটির সিনেমাগুলোর ন্যারেটিভ প্যাটার্ন নিয়ে কথা বলবো। ১৯৭০ ও ৮০ এর দশকে তারা একসঙ্গে যেসব সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন, সেগুলো শুধু বাণিজ্যিকভাবে সফলই ছিল না। বরং সমাজকে দেখার একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিও প্রতিষ্ঠা করেছিল। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সিনেমাগুলোর গল্পে একটি পরিকল্পিত শ্রেণি-বিন্যাস ও চরিত্র নির্মাণের ধারা দেখা যায়।
এই ধারায় সাধারণত ধনী বা পুঁজিবাদী চরিত্রগুলোকে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে দেখানো হতো। তারা ক্ষমতাবান, শোষণকারী এবং নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এমনভাবে উপস্থাপিত হতো। এই ধনী চরিত্রগুলোর সঙ্গে প্রায়শই সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের কিছু প্রতীকী বৈশিষ্ট্য জুড়ে দেওয়া হতো, যার ফলে দর্শকের অবচেতন মনে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক চিত্র গড়ে উঠত। অপরদিকে, ওয়ার্কিং লেবার ক্লাস বা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের চরিত্রগুলোকে ন্যায়পরায়ণ, নির্যাতিত এবং নৈতিকভাবে উচ্চতর হিসেবে দেখানো হতো।
সমালোচকদের দাবি হলো, এই শ্রমজীবী চরিত্রগুলোর সঙ্গে অনেক সময় সংখ্যালঘু পরিচয় জুড়ে দেওয়া হয়েছে। গল্পের কাঠামো এমনভাবে সাজানো হতো, যেন তারা নির্যাতনের শিকার, অথচ শান্তিপূর্ণ, সহনশীল এবং প্রায় দেবদূতসুলভ আচরণে বিশ্বাসী। তাদের ওপর যে অত্যাচার দেখানো হতো, তার জন্য দায়ী করা হতো ক্ষমতাবান পুঁজিবাদী শ্রেণিকে। এই প্যাটার্ন বারবার পুনরাবৃত্তি হওয়ার ফলে দর্শকের মনে একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ স্বাভাবিক হয়ে উঠতে শুরু করে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই গল্পগুলো সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু ইঙ্গিতের মাধ্যমে অনেক কিছু বলে দেয়। নায়ক ও ভিলেনের লড়াই ধীরে ধীরে ব্যক্তি পর্যায় ছাড়িয়ে শ্রেণি ও পরিচয়ের প্রতীকে রূপ নেয়। এটিকেই অনেকে সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর একটি রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে আবেগ ও সহানুভূতির মাধ্যমে দর্শকের চিন্তাধারাকে নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত করা হয়।
এই ধরনের ন্যারেটিভ নির্মাণের পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশের প্রভাবের কথাও অনেকেই উল্লেখ করেন। কংগ্রেস শাসনামলে সমাজতান্ত্রিক ও লেফট-ঘেঁষা চিন্তাধারা যেমন রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছিল, তেমনি সিনেমার গল্প বলার ধরনেও তার ছাপ পড়েছিল। সব সিনেমা বা সব চরিত্র অবশ্যই এই ছাঁচে পড়ে না, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরণের ন্যারেটিভ চলতে থাকলে তা সমাজের চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলে এটাই এই আলোচনার মূল বক্তব্য।
বলিউড, আন্ডারওয়ার্ল্ড ও পেট্রো-ডলার দিয়ে সিনেমার আড়াল ধর্ম ও বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল
সেই সময়কার বলিউডের প্রেক্ষাপট বুঝতে গেলে তখনকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের দাপটের কথাও মনে রাখতে হয়। দাউদ ইব্রাহিম, করিম লালা, হাজি মস্তান এই নামগুলো শুধু অপরাধ জগতেই নয। বলিউডের অন্দরের আলোচনাতেও ঘুরে ফিরে আসত। বিভিন্ন অনুসন্ধানী রিপোর্ট ও সাংবাদিক লেখায় বারবার উঠে এসেছে যে তখন সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব ছিল। আর অর্থায়নের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকা, বিশেষ করে দুবাই থেকে আসত। এই অর্থকে অনেকেই পেট্রো-ডলারের ছায়া অর্থ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলে সিনেমার বিষয়বস্তু, চরিত্র নির্মাণ এবং গল্প বলার ধরনে সেই সময়কার বাস্তবতার ছাপ পড়াটা অস্বাভাবিক ছিল না।
এই পটভূমিতে জাভেদ আখতারের একক কাজগুলোর দিকে তাকালে একটি ধারাবাহিক ন্যারেটিভ চোখে পড়ে। ১৯৮৩ থেকে প্রায় ২০০৬ সালের মধ্যে তিনি একাই প্রায় চৌদ্দটি সিনেমার চিত্রনাট্য লেখেন। যেগুলোর বেশিরভাগই একই ধরনের সামাজিক ও আদর্শিক কাঠামো অনুসরণ করেছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন। এই সিনেমাগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যর্থ, সমাজ অন্যায়ে ভরা, আর নায়ক সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক রাগী কিন্তু নৈতিকভাবে সঠিক মানুষ।
এর একটি পরিচিত উদাহরণ হলো জনপ্রিয় সিনেমা দেওয়ার। এই ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের চরিত্রটি একজন ওয়ার্কিং লেবার ক্লাসের মানুষ কঠোর বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে ওঠা, সংগ্রামী এবং ক্ষুব্ধ। তিনি হিন্দু পরিবার থেকে এলেও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি তার গভীর অনাস্থা দেখানো হয়। ছবিতে একটি দৃশ্যে দেখা যায়, তার মা পূজার থালি নিয়ে এলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং প্রশ্ন তোলেন ভগবান কোথায় ছিলেন, যখন অন্যায়গুলো ঘটছিল? এই দৃশ্যটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং ধর্ম ও প্রথার প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
সমালোচকদের মতে, এই ধরনের দৃশ্য ও সংলাপ বারবার দেখানোর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট ভাবনা স্বাভাবিক করে তোলা হয় যেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসকে অসহায় বা অকার্যকর হিসেবে দেখানো হয়, আর সামাজিক সংগ্রামকে একমাত্র ন্যায়সঙ্গত পথ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এটি সরাসরি কোনো ধর্ম বা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বক্তব্য না দিলেও, দর্শকের অবচেতন মনে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তখনকার বলিউড শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না। বরং আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং আদর্শিক ন্যারেটিভ। এই সবকিছুর মিলনে এটি একটি শক্তিশালী সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছিল। আর সেই প্রভাব আজও বহু মানুষের স্মৃতি ও মানসিকতায় রয়ে গেছে।
ধর্ম, প্রতীক ও আবেগ মাধ্যমে সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পর্দার আড়ালে মুসলিমদের হিরো বানানোর কৌশল
তারা এটি বোঝাতে চায় কীভাবে সিনেমার দৃশ্য, প্রতীক ও সংলাপ ব্যবহার করে। যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট বার্তা দর্শকের মনে গেঁথে দেওয়া হয়। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে তারা কোন এক জাতিকে প্রমট করতেছে।
এরপর সিনেমার ভেতরে এমন কিছু প্রতীকী দৃশ্য আসে, যেগুলো সরাসরি কিছু না বলেও গভীর বার্তা দেয়। গল্পে দেখা যায়, এক চরিত্র যাকে “রহিম চাচা” ধরনের একজন হিসেবে দেখানো হয়েছে। নায়কের হাতে একটি বিশেষ বালা বা ব্রেসলেট পরিয়ে দেন। সেই বালার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার প্রতীকী গুরুত্ব। দর্শককে বোঝানো হয়, এই সংখ্যার পেছনে বিশেষ মাহাত্ম্য আছে, যদিও সেই ব্যাখ্যা কখনো খোলাখুলিভাবে বলা হয় না। কিন্তু ইঙ্গিতের মাধ্যমে কৌতূহল ও বিশ্বাস তৈরি করা হয়।
এরপর আরও শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল মেসেজ দেওয়া হয় নায়ক দুইবার গুলিবিদ্ধ হলেও সেই বালার কারণে বেঁচে যান। অর্থাৎ, এই প্রতীকী বস্তুটিই তাকে রক্ষা করে। একই সময়ে ইঙ্গিত করা হয় যে, মন্দিরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেও রক্ষা পাওয়া যায় না। কিন্তু ওই প্রতীকী বালা থাকলে জীবন বাঁচে। পুরো সিনেমা জুড়ে এই বার্তাই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত করা হয় কোন বিশ্বাস কার্যকর, আর কোনটা অকার্যকর।
এই ধরণের ন্যারেটিভ শুধু একটি সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্য অনেক ছবিতেও দেখা যায়। মসজিদে সুতো বাঁধা বা নির্দিষ্ট ধর্মীয় আচার পালন করলেই সব মনস্কামনা পূরণ হয়ে যায় এমন দৃশ্য বারবার দেখানো হয়। জনপ্রিয় সিনেমা ajrangi Bhaijaan-এর মতো উদাহরণে এই আবেগী উপস্থাপন দর্শকের সহানুভূতি ও বিশ্বাসকে নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করে।
এছাড়াও কিছু সিনেমার নামই নিজেই একটি সরাসরি বার্তা বহন করে। যেমন, Ram Teri Ganga Maili এই নামের মাধ্যমেই একটি প্রতীকী বক্তব্য দেওয়া হয়, যা দর্শকের মনে ধর্ম, পবিত্রতা ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করে। নাম, গল্প ও দৃশ্য সব মিলিয়ে একটি সাবটেক্সট কাজ করতে থাকে।
এইসব সিনেমায় কারা অভিনয় করেছেন, তাদের ব্যক্তিগত পরিচয় বা অতীত নিয়ে এখানে বিশদ বলা জরুরি নয়। আসল বিষয় হলো এই ছবিগুলো কীভাবে প্রতীক, আবেগ ও ভিজ্যুয়াল ভাষা ব্যবহার করে দর্শকের মানসিক কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে। সরাসরি কিছু না বলেও, ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও আদর্শিক ন্যারেটিভ স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে।
এটাই সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ যেখানে সিনেমা শুধু বিনোদন নয়। বরং চিন্তা গঠনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। এগুলো পড়ে ও বুঝে দেখলেই বোঝা যায়, কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে সমাজের ভেতরে এই বার্তাগুলো ছড়িয়ে
পেট্রো-ডলার ও আন্ডারওয়ার্ল্ড এর মাধ্যমে জীবন ও গল্পের সমন্বয়ে বলিউডে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তনের কৌশল?
গুলশান কুমারের নাম অনেকেই শুনেছে, আবার অনেকেই জানে না। এই জেনারেশন হয়তো তাকে জানে না। গুলশান কুমার ছিলেন টেলিভিশন সিরিজের করণাধার, ভক্তি গীতি এবং ধার্মিক গানগুলোর জন্য পরিচিত। তার সিনেমা ও কাজগুলো ধার্মিকতা, ভক্তি এবং ধর্মীয় আবেগকে কেন্দ্র করে তৈরি হতো। তিনি দর্শকের মনে বিশ্বাস ও মানসিকতার বিশেষ প্রভাব ফেলার চেষ্টা করতেন।
কিন্তু বলিউডের সেই সময়ের বাস্তবতা অন্যরকম ছিল। দাউদ ইব্রাহিম, হাজি মস্তানসহ আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় বড় নাম তখন বলিউডে প্রবেশ করে প্রভাব বিস্তার করছিল। বিভিন্ন অনুসন্ধানী রিপোর্টে উঠে এসেছে যে দুবাই থেকে আসা অর্থায়ন বা পেট্রো-ডলারের ছায়া অর্থের মাধ্যমে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে ফান্ডিং হতো। এই জায়গায় গুলশান কুমারের মতো শিল্পীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উনি কোনোদিন নিজেকে এই শক্তিশালী নেটওয়ার্কের কাছে সমর্পণ করেননি। ঠিক এই কারণে তাদের থেকে চাপ ও হুমকি ছিল, এবং এই বাস্তবতা তাকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছিল।
সম্প্রতি যে ভিক্টিমের কথা আলোচনায় এসেছে, তিনি হলেন সুশান্ত সিং রাজপুত। তার দিদি ইন্টারভিউতে বলেছেন, শেষের দিকে বারবার সুশান্ত বলতেন “এরা আমাকে বাঁচাবে না, আমাকে বাঁচাবে না।” এই বক্তব্য দেখায়, কিভাবে বলিউডের ভিতরে থাকা শক্তিশালী আন্ডারওয়ার্ল্ড, অর্থায়ন ও প্রভাব শিল্পীর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে সীমিত করতে পারে।
এই ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যা নয়। এটি দেখায় যে বলিউড, সিনেমা এবং টেলিভিশন কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়। দীর্ঘ সময় ধরে শিল্পীদের চরিত্র, সিনেমার থিম এবং গল্পের মাধ্যমে দর্শকের মানসিকতা ও সমাজের ওপর ধাপে ধাপে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। ধার্মিক বা ভক্তিমূলক সিনেমা যেমন দর্শকের আবেগ ও বিশ্বাসকে প্রভাবিত করে। তেমনি ক্রাইম, থ্রিলার বা সামাজিক ন্যারেটিভের সিনেমা দর্শকের চিন্তাভাবনায় একটি নির্দিষ্ট বার্তা ঢেলে দেয়।
মূল কথা হলো, যারা নিজস্ব নৈতিকতা, বিশ্বাস বা স্বাধীনতা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, যেমন গুলশান কুমার বা সুশান্ত সিং, তাদের ওপর এই সমস্ত চাপ আরও স্পষ্টভাবে কাজ করেছে। আর দর্শকের মনেও দীর্ঘমেয়াদে এই ধরণের বার্তা এবং ন্যারেটিভ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে। বলিউড কেবল বিনোদনের জায়গা নয়। এটি একটি শক্তিশালী সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে শিল্পীর জীবন ও গল্প মিলিয়ে সমাজের ওপর প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে।
পেট্রো ডলার ও বিদেশি ফান্ডিং এর ভারতীয় মুসলিম সমাজে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও রাডিকালাইজেশন?
তো এখানে একটা কথা বলি, যেটা একটু মন দিয়ে শুনবেন। আমি সেই ভিডিওতেও বলেছি, যেখানে বলেছিলাম, কিভাবে পেট্রো ডলার ভারতে এবং উপমহাদেশে রাডিকালাইজেশন চালাতে ব্যবহার হয়েছে। আবারো একটু বুজাই, যেটা ১৯৭০–৭১ সালের পর থেকে শুরু হয়েছে। গালফের দেশগুলো, অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, এই পেট্রো ডলারের মাধ্যমে ফান্ড করে মূলত দুইটা কাজ ভারতে করেছিল।
একটা হলো ভারতীয় মুসলমানদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা। তারা যাদেরকে হার্ডলাইন রিলিজিয়াস প্রাকটিসে আনার চেষ্টা করছিল, তাদেরকে ধীরে ধীরে রাডিকাল বানানো হতো। এই কাজের জন্য স্কলারশিপ, ট্রেনিং, পাঠানো সবই ব্যবহার করা হতো। এইভাবে লোকাল ইনফ্লুয়েন্স তৈরি করা হতো। তাদের পাঠানো হতো শেখার জন্য, তারপর তারা ফিরে এসে নিজ নিজ এলাকার মানুষদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করত। এভাবেই ধীরে ধীরে কিছু কমিউনিটি রাডিকাল হয়ে উঠছিল।
দ্বিতীয় কাজ ছিল ভারতের বাইরে প্রভাব বিস্তার। যাদেরকে রাডিকাল বানানো হতো, তারা কখনো কখনো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতো। অর্থাৎ শুধু ধর্মীয় চেতনা নয়, একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও তৈরি হতো। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে সমাজের বিভিন্ন অংশে নেটওয়ার্ক তৈরি হওয়া এবং নির্দিষ্ট মতবাদ ছড়ানো সম্ভব হয়।
আমি ভিডিওতে বলেছি, এই পুরো প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ছিল ধীরে ধীরে জনগণের মনকে একটি নির্দিষ্ট দিকের দিকে পরিচালিত করা। লোকাল স্কুল বা ধর্মীয় ট্রেনিং সেন্টার, স্কলারশিপ, প্রশিক্ষণ সবই একটি পরিকল্পিত স্ট্রাটেজি। এইভাবে তারা নতুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করত। ধীরে ধীরে একটি কমিউনিটির মধ্যে বিশ্বাস, প্রাকটিস এবং আচরণ পরিবর্তিত হতো।
এটি একদিন বা একমাসের কাজ নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, প্রায় দশক ধরে চালানো হয়। ১৯৭১ সালের পর থেকে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে এই ধরনের প্রভাব তৈরি করা শুরু হয়েছিল, আর এটি পেট্রো ডলারের বড় ভূমিকা।
তো বুঝলেন, কিভাবে অর্থ এবং বিদেশি ফান্ডিং ব্যবহার করে সামাজিক এবং ধর্মীয় প্রাকটিসের মাধ্যমে একটি পুরো কমিউনিটি ধীরে ধীরে রাডিকালাইজ করা যায়। এটাও দেখায় যে, অর্থ এবং প্রভাব কেবল ব্যবসা বা রাজনীতিতেই নয়, সামাজিক চেতনা গঠনের জন্যও ব্যবহৃত হতে পারে।
নন-মুসলমান সমাজে সোশাল ইঞ্জিনিয়ারিং অর্থ, আদর্শ ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার
এবার জেটা এই দিকে আছে, সেটা হলো নন-মুসলমানরা। নন-মুসলমানদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আমরা হিন্দুরা। এই ছাড়া, সত্তিকার সংখ্যালোগু যেমন বৌদ্ধ, জাইন, আশিক ও আছে। পশ্চিমবঙ্গের ডিকশনারিতে এদের আলাদা সংখ্যালোগু হিসেবে উল্লেখ আছে। কিন্তু মূল বিষয় হলো, আমাদের হিন্দুদের ওপর যে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। তা পেট্রো ডলারের ফান্ডিং দিয়ে করা হয়েছে। এই ফান্ডিং-এর মাধ্যমে আমাদেরকে ধীরে ধীরে সেক্যুলার বানানোর চেষ্টা চালানো হয়েছে এবং ইসলামাইজেশনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তো, সেক্যুলার বানানো হয় কীভাবে? এখানে সাহায্য করেছে যে কমিউনিস্টরা, যারা ওপরে হোডিং টানিয়ে রেখেছে। তারা বলে আমরা কমিউনিজম, অর্থাৎ ক্যাপিটালিজমের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। কিন্তু বাস্তবে, এই হোডিংয়ের পেছনে অন্য কাজ হচ্ছে। আর সেই অন্য কাজ হলো। আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মূল আদর্শকে অপমান করা, অবহেলা করা, নীচু দেখানো।
এই প্রক্রিয়ায় তারা ধীরে ধীরে আমাদের জেনারেশনকে প্রভাবিত করছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া সবকিছুর মাধ্যমে আমাদেরকে এমনভাবে ট্রেন করা হচ্ছে যে আমরা নিজের সংস্কৃতি, নিজের ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করি। তারা চায় আমাদের চিন্তাভাবনা এবং মানসিকতা পরিবর্তিত হোক। আমরা যখন দেখব আমাদের ধর্মীয় চর্চা পুরনো বা অপ্রাসঙ্গিক, তখন আমরা সেক্যুলার বা পশ্চিমা মানদণ্ডের দিকে ঝুঁকব।
স্কুলের পাঠ্যক্রম, সাহিত্য, সিনেমা, গান, নাটক সবকিছুর মাধ্যমে বারবার এই মেসেজ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে একটি ন্যারেটিভ তৈরি হচ্ছে, যেখানে তারা নিজেদের ধর্মীয় চেতনা ও সংস্কৃতিকে ছোট বা নীচু মনে করতে শুরু করছে। আর তখনই ইসলামাইজেশনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত মানুষ তৈরি হচ্ছে।
এই হলো পুরো পরিকল্পনা ধীরে ধীরে, দীর্ঘমেয়াদীভাবে। এটি একদিনের বা একমাসের কাজ নয়। পুরো প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো হিন্দু কমিউনিটিকে এমনভাবে প্রভাবিত করা যে তারা নিজেদের সংস্কৃতি এবং ধর্মের উপর আস্থা হারায়। আর সেই সময়ই, যেসব বাহ্যিক অর্থ ও নেটওয়ার্ক আছে যেমন গালফের পেট্রো ডলার তারা এই প্রভাবকে শক্তিশালী করে।
তো বুঝলেন, কীভাবে পেট্রো ডলার, মিডিয়া এবং কমিউনিস্টদের সহায়তায় আমাদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চেতনা ধীরে ধীরে অপমানিত হয় এবং নতুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করে। পুরো প্রক্রিয়াটা দীর্ঘমেয়াদী, সিস্টেম্যাটিক এবং পরিকল্পিত।
স্কুল, মিডিয়া ও সংস্কৃতির মাধ্যমে চিন্তা বদলের প্রক্রিয়া হিন্দু সমাজে পরিকল্পিত সামাজিক রূপান্তর
হিন্দু সমাজে সামাজিক পরিবর্তন প্রায়শই ধীরে ধীরে হলেও স্থিতিশীলভাবে ঘটে। তবে আধুনিক যুগে স্কুল, মিডিয়া এবং সাংস্কৃতিক মাধ্যমগুলির মাধ্যমে এই পরিবর্তনকে পরিকল্পিতভাবে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা, মিডিয়া এবং সংস্কৃতির প্রভাব একত্রিত হয়ে সমাজের মানুষদের চিন্তাভাবনা ও মূল্যবোধে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
স্কুল শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞানচর্চা, সমতার ধারণা এবং যুক্তিবাদী চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, হিন্দু সমাজে প্রথাগত বিশ্বাস ও কুসংস্কারের পরিবর্তে সমসাময়িক শিক্ষার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাঠ্যক্রমে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রথাগত চিন্তার বাইরে ভাবতে শেখে। এর ফলে নারী শিক্ষা, জাতপাত, বঞ্চনা ও সামাজিক বৈষম্য সম্পর্কিত ধারণাগুলো পরিবর্তনের মুখ দেখে।
মিডিয়াও সামাজিক রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে হিন্দু সমাজে নতুন ধারণা ও সামাজিক নীতি প্রচার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, নারী ক্ষমতায়ন, শিশুশ্রমের অবসান এবং দারিদ্র্য নিরসনে সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মিডিয়ার অবদান অসীম। মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষ সহজেই বৈশ্বিক চিন্তা, আধুনিক জীবনধারা এবং মানবাধিকারের ধারণা গ্রহণ করতে পারে।
সংস্কৃতিও চিন্তাভাবনা পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। নাটক, গীতি, নৃত্য ও সাহিত্য সমাজে নৈতিক ও সামাজিক বার্তা পৌঁছে দেয়। হিন্দু সমাজে পুরাতন কুসংস্কার ও প্রথাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন নৈতিক ও সামাজিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংস্কৃতির প্রভাব অসীম। উদাহরণস্বরূপ, সিনেমা বা নাটকের মাধ্যমে নারী স্বাধীনতা, শিক্ষার গুরুত্ব ও সামাজিক সাম্য সম্পর্কে সমাজ সচেতন হয়।
সার্বিকভাবে বলা যায়, হিন্দু সমাজে পরিকল্পিত সামাজিক রূপান্তর বাস্তবায়নে স্কুল, মিডিয়া এবং সংস্কৃতির সমন্বিত প্রভাব অপরিহার্য। স্কুল শিক্ষার মাধ্যমে চিন্তাধারার ভিত্তি তৈরি হয়, মিডিয়া দ্রুত এবং বিস্তৃতভাবে ধারণা প্রচার করে, এবং সংস্কৃতি মানসিক ও নৈতিক স্তরে পরিবর্তন আনে। এভাবে, সমাজ ধীরে ধীরে আরও উদার, সমানাধিকারে বিশ্বাসী ও প্রগতিশীল হয়ে ওঠে।
টালিগঞ্জের সিনেমার পর্দায় আড়ালেও পেট্রো-ডলার সমাজ-গঠনের নতুন কৌশল
এবার আসি আমাদের সবার প্রিয় টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রি। তো, এই টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে কি হচ্ছে? যা বলিউড এতকাল ধরে করেছে, সেই কাজই তারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ আমরা জানি যে টালিগঞ্জের ইন্ডাস্ট্রির একটা বিশাল অংশ কমিউনিস্ট ইনফ্লুয়েন্সে পরিচালিত। কেউ কেয় দায়রেক্টভাবে জড়িত, কেউ হয়তো জড়িত নয়, কিন্তু ওই ইনফ্লুয়েন্সের কারণে সব কিছু পরিচালিত হচ্ছে। আমি বারবার বলব এটা শুধু ছোট বা অপ্রাসঙ্গিক কোনো ঘটনা নয়, এটা একটি বড় কাংশো।
তারা কি করছে? আগের সাতর্ষ-আশির দশকে এই ধরনের কাজ শুরু হয়েছিল, চিরকালই চলে আসছে। কিন্তু এখন যেন এই প্রক্রিয়ার মাত্রা বেড়েছে। এখন এটি অধিক ফোকাস করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের ডিকশনারিতে যেসব সম্প্রদায় সংখ্যা অনুযায়ী ছোট, তারা কতটা ভিক্টিম, কতটা লাঞ্ছিত বা অত্যাচারিত প্রায় প্রতিটি সিনেমায় সেই ম্যাসেজ বারবার দেখানো হচ্ছে।
উদাহরণ দিতে গেলে, ধরুন কোনো সিনেমা রিলিজ করা হলো। সিনেমায় দেখা যায় একটি পুলিশ অফিসার চরিত্র। যদি সেই পুলিশ অফিসার ওই বিশেষ সম্প্রদায়ের হয়, তাহলে তাকে দেখানো হয় সবচেয়ে সত, সবচেয়ে লয়াল। কিন্তু তার জীবন কষ্ট, দারিদ্র্য এবং সংগ্রামের মধ্যে ভরা। অর্থাৎ, দর্শকের মনে বারবার এই ন্যারেটিভ ঢুকানো হচ্ছে যে এই সম্প্রদায়ের মানুষরা ধনী বা ক্ষমতাশালী নয়, তারা শোষিত, লাঞ্ছিত এবং সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ।
এছাড়া, সিনেমার গল্প, সংলাপ এবং চরিত্রায়নের মাধ্যমে এক ধরনের সিস্টেম্যাটিক বার্তা দেওয়া হয়। এটা শুধু গল্প বলার কাজ নয়; এটি সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। দর্শকের মানসিকতা ধীরে ধীরে গড়ে তোলা হয়। যেখানে তারা এক সম্প্রদায়কে সহানুভূতিশীল, ন্যায়পরায়ণ এবং নিরীহ হিসেবে দেখবে, এবং অন্য সম্প্রদায়ের ওপর একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি হবে।
যেমন বলিউডের কাজগুলোতে এক সময় একই প্রক্রিয়া লক্ষ্য করা গিয়েছিল, টালিগঞ্জও সেই পথে চলছে। সিনেমা, গান, নাটক সবকিছুতে বারবার সেই ম্যাসেজ দেওয়া হচ্ছে। আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দর্শকদের মানসিকতা, ধারণা এবং ধ্যান-ধারণা ধীরে ধীরে প্রভাবিত করা হচ্ছে।
তাই বোঝা যায়, টালিগঞ্জ কেবল বিনোদনের জায়গা নয়; এটি একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যেখানে সিনেমা এবং গল্পের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে।
টালিগঞ্জের সিনেমা ও বিনোদনের আড়ালে সমাজকে গড়ার পরিকল্পিত ন্যারেটিভ ও সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
কোনো একটি সিনেমা রিলিজ করা হয়েছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে ওই বিশেষ সম্প্রদায়ের একজন মানুষ কতটা অতিদারিদ্র্যর মধ্যে বাঁচছে। তার ওপর সমাজ আর হিন্দুরা মিলেমিশে লাঞ্ছনা, অবমাননা এবং অত্যাচার চালাচ্ছে। সেই মানুষটি এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে যে আর কোনো রাস্তা খুঁজে পায় না, শেষ পর্যন্ত সে নিজেই একটি চরম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। বাচ্চাকে কিডন্যাপ করে এবং হাতে শাস্ত্র তুলে নেয়। কারণ তার মনে বিশ্বাস, আর কোনো পথ নেই, সমাজকে শাস্তি দিতে হবে। সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যে বারবার দেখানো হচ্ছে, কতটা নিপীড়িত, কতটা শোষিত সেই মানুষটি।
আরেকটি উদাহরণ দিয়ে বোঝাই, কোনো সিনেমা শুরুর মাত্র চারটি চেয়ার বসিয়ে মিস্ট্রি সমাধান করতে করতে পুরো সিনেমার প্লট তৈরি করা হয়েছে। সেখানে এক জন চরিত্রকে তিলক কাটিয়ে হিন্দু হিসেবে দেখানো হয়েছে। আরেক জনকে টোপি দিয়ে বা টোপি না দিয়ে স্মার্ট ছেলে হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যাকে বিশেষ সম্প্রদায়ের হিসেবে দেখানো হয়েছে। পুরো সিনেমায় বারবার এই মেসেজ দেওয়া হয়েছে হিন্দু চরিত্রটি যত ভালো গুণাবলী থাকুক, তাকে ছোট, অপমানিত এবং নীচু দেখানো হচ্ছে।
প্রতি দৃশ্যে, হিন্দু চরিত্রটি তার স্থানীয় সম্প্রদায়ের কাছে বা সমাজের কাছে এক ধরনের লাঞ্ছনার শিকার হয়। দর্শক বারবার দেখছে, যে সমাজ, পরিবার বা বড় অংশের মানুষ তাকে কীভাবে দমন করছে, নিপীড়িত করছে। আর সেই সময়, বিশেষ সম্প্রদায়ের ছেলে বা চরিত্রটি সবসময় সত, বুদ্ধিমান এবং ন্যায়পরায়ণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। অর্থাৎ সিনেমার পুরো নির্মাণই একটি নির্দিষ্ট বার্তা দেয় কোনো সম্প্রদায়কে অপরাধী, অপর্যাপ্ত বা নীচু হিসেবে দেখানো এবং অন্য সম্প্রদায়কে পুণ্যবান ও ন্যায়পরায়ণ হিসেবে দেখানো।
এভাবে টালিগঞ্জ বা অন্য যে কোনো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সিনেমা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়। সিনেমার প্রতিটি গল্প, চরিত্রায়ন, সংলাপ সবই একটি পরিকল্পিত সামাজিক বার্তা ছড়ায়। দর্শকের মস্তিষ্কে বারবার নির্দিষ্ট প্রভাব তৈরি হয়। নতুন প্রজন্ম, যারা সিনেমা দেখে বড় হচ্ছে, তারা এমন বার্তা গ্রহণ করে এবং সমাজের একটি নির্দিষ্ট ধারায় ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
সিনেমার এই ধরনের পরিকল্পিত উপস্থাপনাই হলো সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। সিনেমার প্রতিটি চরিত্র, প্রতিটি দৃশ্য এবং প্রতিটি সংলাপের মাধ্যমে সমাজের চেতনা, মূল্যবোধ এবং প্রজন্মের মানসিকতা ধীরে ধীরে প্রভাবিত করা হচ্ছে।
সিনেমা, গান ও নাট্য ও শিল্পের মাধ্যমে সনাতন সংস্কৃতিকে ভুলভাবে উপস্থাপন ও ছোট করার পরিকল্পিত প্রভাব
আজকে কিছু গায়করা, যাদের গান শুনে আমরা আমাদের পরিশ্রমের অর্থ খরচ করি, সেই গায়করা গান বিক্রি করে তাদের জীবন চালাচ্ছেন। কিন্তু এই গায়কদের অনেকের গান আজকাল সেইভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে যে, গানের মূল সুর, সারে-গামা, যেটার উৎপত্তি বেদ থেকে সেই সনাতন বেদ গ্রন্থ থেকেই এসেছে সে সম্পূর্ণভাবে ভুলভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। একদিকে তারা স্টেজে উঠে আমাদের হিন্দু ধর্ম, সনাতন ধর্মকে অপমান করছে। তারা জানে না বা জানার চেষ্টা করছে না যে, সেই শিল্পকলা, নৃত্য, গান, চিত্রনাট্য সবকিছুর জন্মদাতা সনাতন ধর্ম।
আজকের সিনেমা জগত বা টেলিভিশন, চিত্রনাট্য এবং নৃত্য-সঙ্গীতের মাধ্যমের ওপর আমরা তাকাই। কিন্তু আমাদের সংস্কৃতিকে ধীরে ধীরে বদলে দেওয়া হচ্ছে। যারা সিনেমা, গান বা নাটকের মাধ্যমে আমাদের সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করছে। তারা প্রায়শই সনাতন ধর্মকে শুধু একটি “বাংলা আর্ট” হিসেবে দেখাচ্ছে। আসলে সনাতন ধর্মের মূল অর্থ হলো চিরন্তন, ইটারনাল যা শাস্ত্রগত এবং যার কোনো শেষ নেই। কিন্তু আজকে সেই চিরন্তনতার স্থলে আমরা দেখতে পাই কেবল সাময়িক, আধা-বাংলা আঙ্গিকে সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করা, যা মূল অর্থকে অপমান করছে।
এভাবেই সনাতন সংস্কৃতির সবকিছু ব্যবহার করা হচ্ছে সিনেমা, গান এবং বিনোদনের মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। আমাদের প্রাচীন শিল্প, সংগীত, নৃত্য সবকিছু এখন এমনভাবে উপস্থাপন হচ্ছে যে দর্শক মনে করবে এগুলো শুধু বিনোদনের অংশ। কিন্তু বাস্তবে এর আড়ালে একটা গভীর বার্তা রয়েছে সনাতন সংস্কৃতিকে ছোট করা, অপমান করা এবং নতুন প্রজন্মকে এর গুরুত্ব থেকে বিচ্যুত করা।
সবশেষে বলতে হবে, বলিউডে আজকাল এই প্রক্রিয়ার জেরে সনাতন সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। সিনেমা, গান, এবং স্টেজ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বারবার এই বার্তা ছড়ানো হচ্ছে। যে, আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতি, হিন্দু ধর্ম এবং সনাতন শিক্ষার কোনো মূল্য নেই। এভাবে পুরো বিনোদন জগতকে ব্যবহার করা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট দিক থেকে দর্শকের মানসিকতাকে প্রভাবিত করার জন্য।
এই প্রক্রিয়ার প্রভাবে আমাদের নতুন প্রজন্ম হয়তো বুঝতে পারবে না। আসলে সনাতন ধর্ম এবং সংস্কৃতির আসল মূল্য কত গভীর। আজকের দিনে বলিউডের এই কাজ আমাদের সংস্কৃতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
উৎসবের চমক বনাম সামাজিক বাস্তবতায় দুর্গাপুজোকে ব্যবহার করে হিন্দু চরিত্রকে ছোট করার কৌশল
এবার সবচেয়ে মজার বিষয়টা কী জানেন? এই ইন্ডাস্ট্রি টালিগঞ্জ বলুন, সিনেমা বলুন, সিরিয়াল বলুন সবাই কিন্তু সমান্তরালে দুর্গাপুজোকে ব্যবহার করে যাচ্ছে। কারণ খুব সোজা কথা, অন্য সম্প্রদায়ের উৎসবকে ঘিরে এত বড় বিজনেস দাঁড় করানো যায় না। দুর্গাপুজো ছাড়া এই রাজ্যে এমন কোনো উৎসব নেই, যাকে কেন্দ্র করে এত বড় অর্থনীতি, এত বড় শিল্প, এত বড় বাজার তৈরি হয়।
দুর্গাপুজো মানেই আনন্দ, উৎসব, নাচ, গান। মহিলারা মাথা থেকে পা পর্যন্ত অলংকারে সাজে, শাড়ি, গয়না, শাজ-গোজ, খাবার-দাবার, প্যান্ডেল, ডেকোরেশন, আলো, ঢাক, ধোল এই সবকিছু মিলিয়ে এক বিশাল উৎসব।
এই সবকিছু কে এনে দেয়? কে এই ইকনমিকে ঘোরায়? ইকনমি কে চালায়? ধর্ম চালায়। আর কোন ধর্ম? আমাদের ধর্ম। কীভাবে চালায়? প্রাচীনকাল থেকেই মন্দির-কেন্দ্রিক অর্থনীতি দিয়ে। এটা আমি বারবার বলব, কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেটা প্রমাণ হয়, আজও হচ্ছে।
তাই দুর্গাপুজোকে ব্যবহার করতেই হবে। কারণ অন্য সম্প্রদায়ের উৎসব ব্যবহার করে ঢাক-ধোল, এত অলংকার, এত আনন্দ, এত ভিজ্যুয়াল দেখানো সম্ভব নয়। তাই দুর্গাপুজো পুরোপুরি ব্যবহার করা হবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মা দুর্গাকে ব্যবহার করা হলেও, মা দুর্গার সন্তানদের, মানে আমাদেরকেই সবসময় ছোট করে দেখানো হবে। গল্পে, চরিত্রে, ডায়লগে, বার্তায় সব জায়গায়।
একদিকে পুজোর ভিজ্যুয়াল, আলো, গান, নাচ দিয়ে ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসা চলবে, অন্যদিকে সেই একই সিনেমা বা সিরিয়ালে হিন্দু চরিত্রকে ভিলেন, সংকীর্ণ, অত্যাচারী, পিছিয়ে পড়া হিসেবে দেখানো হবে। আর বাস্তবে কত গ্রামে দুর্গাপুজো বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, কত জায়গায় অত্যাচারের কারণে পুজো হচ্ছে না এই সত্যগুলো কোথাও দেখানো হবে না। সেগুলো বলা হবে না, দেখানো হবে না।
এই দ্বিচারিতা দিনের পর দিন চলছে। ধর্মের ইকনমি ব্যবহার করা হবে, কিন্তু ধর্মকে সম্মান করা হবে না। সংস্কৃতিকে ব্যবহার করা হবে, কিন্তু সেই সংস্কৃতির মানুষদের অবহেলা করা হবে।
তবুও আমি বিশ্বাস করি, টালিগঞ্জের এই অন্ধকার খুব শিগগিরই দূর হবে। ধীরে ধীরে মানুষ বুঝছে, প্রশ্ন করছে। আর একবার মানুষ জেগে উঠলে, এই সব ভণ্ডামি বেশিদিন টিকবে না হবে না, হতেই পারে না।
ভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি প্রত্যাখ্যান ও অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বাস্তবতা
এতোক্ষণ আমরা দুর্গাপুজোর কথা বলেছি, কিন্তু অন্যান্য পুজাপার্বনও অর্থনৈতিকভাবে বিরাট প্রভাব ফেলছে। পূজা, উৎসব, নাচ, গান, খাদ্য, ডেকোরেশন সব মিলিয়ে এই সময়ে অর্থনীতি তুঙ্গে পৌঁছে। তবে মজার বিষয় হলো ভারতবর্ষে যে মুসলিম সম্প্রদায় রয়েছে, তারা এই পুজাপার্বনের সময় ব্যাপকভাবে অর্থ উপার্জন করে। ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক থেকে এটা তাদের জন্য বড় সুযোগ, তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে।
অন্যদিকে, তারা সেই উৎসবগুলো বিশ্বাস করে না। হিন্দুদের পূজা, রীতি-নীতি তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। তারা কখনো পূজা বা পার্বনকে নিজের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করে না। অনেক ক্ষেত্রে তারা হিন্দুদের প্রতিমা ভেঙে ফেলে, পূজার আচার-অনুষ্ঠানকে অসম্মান করে। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রায়ই দেখা যায় যে এই ব্যবসা-অর্থ উপার্জন করা হয় প্রায় ‘পেট্রো ডলার’ এর সাহায্যে, অর্থাৎ বহিরাগত তহবিল বা প্রভাবের মাধ্যমে।
আরও লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, হিন্দুদের পুজাপার্বনে ব্যবসা করলেও তারা নিজ মাহফিল বা অন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে অর্থ উপার্জন করার সুযোগ দেয় না। বরং সেখানে বাধা দেয়, অবহেলা করে, এমনকি হিন্দুদের ব্যবসা-বাণিজ্যকে ধ্বংস বা লুট করার চেষ্টা চলে। অর্থাৎ একদিকে তারা হিন্দুদের উৎসবকে ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য ব্যবহার করে। অন্যদিকে নিজেদের অনুষ্ঠান বা পার্বনে একইভাবে ব্যবসার সুযোগ দেয় না।
এই দ্বিচারিতা প্রমাণ করে যে, কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উৎসবকে তারা ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করছে। কিন্তু অন্য সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি বা ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষতি করার মানসিকতাও সেখানে কাজ করছে। অর্থনৈতিক উপার্জনের সুযোগকে তারা যেকোনোভাবে কাজে লাগাচ্ছে, কিন্তু নৈতিক বা ধর্মীয় সম্মানকে তারা মানছে না।
ফলশ্রুতিতে, হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব এবং অর্থনীতি বারবার ব্যবহৃত হচ্ছে, আবার সেখানে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা কমানো হচ্ছে। উৎসবের আনন্দ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ব্যবসায়িক লাভ সবকিছু ভিন্ন উদ্দেশ্যের সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ার ফলে সমাজের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে, এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে তার উৎসব ও সংস্কৃতিকে নিয়ে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। এই দ্বৈতনীতি এবং অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের চক্র আজও চলমান এবং নতুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করছে।
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!