ভগবদ্গীতা ১৮.৬০ — স্বভাবজাত কর্ম, মোহ ও অনিবার্য কর্মের গভীর সত্য
স্বভাবজেন কৌন্তেয় নিবদ্ধঃ স্বেন কর্মণা।
কর্তুং নেচ্ছসি যম্মোহাৎ করিষ্যস্যবশোহপি তৎ।।৬০।।
অনুবাদঃ হে কৌন্তেয়! মোহবশত তুমি এখন যুদ্ধ করতে ইচ্ছা করছ না, কিন্তু তোমার নিজের স্বভাবজাত কর্মের দ্বারা বশবর্তী হয়ে অবশভাবে তুমি তা করতে প্রবৃত্ত হবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ষাটতম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের স্বভাব, কর্ম, ইচ্ছা, মোহ এবং স্বাধীনতার একটি গভীর সত্য প্রকাশ করেছেন। শ্লোকটি হলো স্বভাবজেন কৌন্তেয় নিবদ্ধঃ স্বেন কর্মণা। কর্তুম্ নেচ্ছসি যন্মোহাৎ করিষ্যস্যবশোऽপি তৎ। এর সহজ অর্থ হলো, হে কুন্তীপুত্র, নিজের স্বভাবজাত কর্মের দ্বারা আবদ্ধ হয়ে তুমি মোহের কারণে যে কর্ম করতে চাইছ না, নিজের ইচ্ছার অধীন না হয়েও শেষ পর্যন্ত সেই কর্মই করবে। এই শ্লোককে কেবল অর্জুনের যুদ্ধসংক্রান্ত পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত গভীরতা উপলব্ধি করা যায় না। এর মধ্যে মানুষের ব্যক্তিত্ব, অন্তর্গত প্রবৃত্তি, কর্মধর্ম, মানসিক দ্বন্দ্ব, স্বাধীন ইচ্ছা এবং আত্মজ্ঞান সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত রয়েছে।
এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ স্বভাবজেন। স্বভাব শব্দটি স্ব এবং ভাব এই দুটি ধারণার সমন্বয়ে গঠিত। স্ব অর্থ নিজের এবং ভাব অর্থ হওয়া, অবস্থা, প্রকৃতি বা অন্তর্নিহিত সত্তার প্রকাশ। স্বভাব অর্থ তাই নিজের প্রকৃতি বা অন্তর্গত প্রবণতা। এর সঙ্গে জন্ম বা উৎপত্তির ধারণা যুক্ত হয়ে স্বভাবজ অর্থ দাঁড়ায় স্বভাব থেকে উৎপন্ন বা স্বভাবজাত। স্বভাবজেন শব্দটি সেই স্বভাবজাত প্রবণতার দ্বারা বোঝায়। এখানে স্বভাব বলতে কেবল সাধারণ অভ্যাস বোঝানো হয়নি। এর মধ্যে মানুষের অন্তর্নিহিত প্রবৃত্তি, সংস্কার, গুণ, কর্মক্ষমতা, মানসিক প্রবণতা এবং প্রকৃতিগত কর্তব্যের ধারণা রয়েছে। একজন মানুষের মধ্যে যে বিশেষ শক্তি ও প্রবণতা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায় এবং তাকে নির্দিষ্ট ধরনের কর্মের দিকে আকৃষ্ট করে, গীতার ভাষায় সেই প্রকৃতিকে স্বভাবের ধারণার মাধ্যমে বোঝা যায়।
কৌন্তেয় শব্দটি অর্জুনের পরিচয়কে স্মরণ করিয়ে দেয়। এর অর্থ কুন্তীর পুত্র। শ্রীকৃষ্ণ যখন অর্জুনকে কৌন্তেয় বলে সম্বোধন করেন, তখন তিনি কেবল একটি পারিবারিক পরিচয় ব্যবহার করছেন না। এর মধ্যে অর্জুনের জীবন, বংশ, সামাজিক অবস্থান এবং কর্তব্যের স্মরণ রয়েছে। মোহের মুহূর্তে মানুষ অনেক সময় নিজের প্রকৃত পরিচয় ও কর্তব্য ভুলে যায়। অর্জুনও আত্মীয়তা, স্নেহ, দুঃখ এবং ভবিষ্যৎ পরিণতির চিন্তায় নিজের কর্তব্য সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছিলেন। তাই কৌন্তেয় সম্বোধনের মধ্যে নিজের প্রকৃতি ও কর্তব্যকে স্মরণ করার একটি গভীর আহ্বান রয়েছে।
এরপর এসেছে নিবদ্ধঃ শব্দটি। এই শব্দটির মূল ধারণা হলো বন্ধন বা আবদ্ধতা। এর মূল ধাতু বন্ধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ যখন কোনো কিছুর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকে তখন তাকে সেই সম্পর্কের দ্বারা আবদ্ধ বলা যায়। গীতার এই শ্লোকে মানুষের স্বভাব ও কর্মের সম্পর্ককে এই আবদ্ধতার ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে। মানুষ মনে করতে পারে যে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং সে ইচ্ছা করলেই তার সমস্ত প্রবণতা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো মানুষের ব্যক্তিত্ব তার অতীত অভিজ্ঞতা, সংস্কার, অভ্যাস, প্রবৃত্তি, গুণ এবং কর্মের দ্বারা গভীরভাবে গঠিত। তাই সে যা করতে চায় এবং তার অন্তর্গত প্রকৃতি তাকে যে দিকে নিয়ে যায়, এই দুইয়ের মধ্যে কখনো কখনো সংঘাত তৈরি হয়।
স্বেন কর্মণা শব্দযুগল এই শ্লোকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্বেন অর্থ নিজের দ্বারা এবং কর্মণা অর্থ কর্ম দ্বারা। কর্ম শব্দটি সংস্কৃত কৃ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ করা, সম্পাদন করা বা কোনো কাজ সম্পন্ন করা। গীতার দর্শনে কর্ম কেবল বাহ্যিক কাজ নয়। মানুষের চিন্তা, উদ্দেশ্য, কর্তব্য, সিদ্ধান্ত এবং কার্যকলাপ মিলিয়ে কর্মের একটি বিস্তৃত ধারণা তৈরি হয়। স্বেন কর্মণা বলতে নিজের কর্ম দ্বারা বোঝানো হলেও এর গভীরে রয়েছে নিজের প্রকৃতি অনুযায়ী যে কর্ম মানুষের জীবনে উপস্থিত হয় সেই কর্মের ধারণা। মানুষের প্রকৃতি তার কর্মের মধ্যে প্রকাশ পায় এবং কর্ম আবার তার চরিত্রকে আরও দৃঢ় করে। এভাবে স্বভাব ও কর্ম পরস্পরের সঙ্গে একটি গভীর চক্রের মতো সম্পর্কিত।
শ্লোকের পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে কর্তুম্ নেচ্ছসি যন্মোহাৎ। অর্থাৎ মোহের কারণে তুমি যা করতে চাইছ না। এখানে মোহ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মোহের মূল ধারণা হলো বিভ্রান্তি, অজ্ঞতা এবং বাস্তবতাকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে না পারা। অর্জুনের মোহ ছিল আত্মীয়তার প্রতি গভীর আসক্তি, যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে ভয়, পাপের আশঙ্কা এবং নিজের কর্তব্য সম্পর্কে দ্বিধা। তিনি যুদ্ধ করতে চাইছিলেন না। কিন্তু কৃষ্ণ দেখাচ্ছেন যে এই অনিচ্ছার পেছনে যে মানসিক অবস্থা কাজ করছে তা সম্পূর্ণ জ্ঞাননির্ভর নয়। অনেক সময় মানুষ যে সিদ্ধান্তকে নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্ত বলে মনে করে, সেটিও ভয়, আসক্তি, দুঃখ, অভ্যাস বা বিভ্রান্তির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।
এই বক্তব্য আধুনিক মানবজীবনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একজন মানুষ হয়তো জানে যে তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে, কিন্তু ভয় বা অনিশ্চয়তার কারণে সে সেই কাজ থেকে পিছিয়ে যেতে চায়। কেউ হয়তো নিজের প্রতিভা সম্পর্কে জানে, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের অভাবে সেই পথে এগোতে চায় না। আবার কেউ হয়তো নিজের প্রকৃত আগ্রহকে উপেক্ষা করে এমন একটি জীবন বেছে নেয় যা তার অন্তর্গত স্বভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই সব পরিস্থিতিতে মানুষের বাহ্যিক ইচ্ছা এবং গভীরতর প্রকৃতির মধ্যে সংঘাত দেখা দিতে পারে। গীতার এই শ্লোক সেই সংঘাতকে একটি বৃহত্তর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করে।
ভগবদ্গীতা ১৮.৬১ — হৃদয়ে ঈশ্বরের অবস্থান, মায়া ও জীবনের পরিচালনার গভীর তত্ত্ব
করিষ্যস্যবশোऽপি তৎ অংশটি শ্লোকটির সবচেয়ে শক্তিশালী বক্তব্যগুলোর একটি। করিষ্যসি অর্থ তুমি করবে এবং অবশ অর্থ নিজের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না থাকা। অর্থাৎ মানুষ মোহের কারণে কোনো কাজ করতে না চাইলেও তার গভীর প্রকৃতি এবং কর্মপ্রবণতা তাকে শেষ পর্যন্ত সেই কর্মের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রশ্ন উঠে আসে। মানুষ কি সত্যিই স্বাধীন। নাকি তার কর্ম পূর্বনির্ধারিত। গীতার এই শ্লোককে সরল নিয়তিবাদ হিসেবে বোঝা উচিত নয়। কৃষ্ণ মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও বিবেচনাকে অস্বীকার করছেন না। বরং তিনি দেখাচ্ছেন যে অজ্ঞ অবস্থায় মানুষের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ থাকে তার নিজের প্রকৃতি, সংস্কার ও প্রবৃত্তির দ্বারা।
এই বিষয়টি গীতার পরবর্তী শিক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে আরও পরিষ্কার হয়। অষ্টাদশ অধ্যায়ের তেষট্টিতম শ্লোকে কৃষ্ণ অর্জুনকে জ্ঞান দেওয়ার পর বলেন যে তিনি সবকিছু বিবেচনা করে নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অর্থাৎ গীতার দর্শনে মানুষ সম্পূর্ণ যন্ত্র নয়। কিন্তু অজ্ঞতা ও মোহের অবস্থায় তার ইচ্ছা অনেকাংশে তার প্রকৃতির দ্বারা চালিত হয়। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মানুষ নিজের প্রকৃতি, প্রবৃত্তি ও মোহকে প্রত্যক্ষ করতে শেখে। তখন তার স্বাধীনতা আরও গভীর অর্থ লাভ করে। সে শুধু নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে না, বরং নিজের প্রবৃত্তিকে জেনে তার সঙ্গে সচেতন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে।
সাংখ্য দর্শনের আলোকে এই শ্লোককে আরও গভীরভাবে বোঝা যায়। সাংখ্য দর্শনে পুরুষ হলো চৈতন্য এবং প্রকৃতি হলো পরিবর্তনশীল জগতের মূল কার্যকারণ শক্তি। প্রকৃতির মধ্যে সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ এই তিন গুণের কার্যকলাপ রয়েছে। মানুষের মানসিক প্রবণতা, কর্ম এবং আচরণে এই গুণগুলোর প্রভাব দেখা যায়। তাই স্বভাবজাত কর্মকে প্রকৃতির গুণগত প্রবাহের প্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়। মানুষ যখন নিজের শরীর, মন এবং প্রকৃতির কার্যকলাপকেই নিজের চূড়ান্ত সত্তা মনে করে তখন সে কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু যখন সে আত্মস্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে তখন কর্মের সঙ্গে তার সম্পর্কের প্রকৃতি পরিবর্তিত হয়।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের আরও গভীর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মানুষের প্রকৃতি এবং তার প্রকৃত আত্মস্বরূপ এক নয়। শরীর, মন, বুদ্ধি, ইন্দ্রিয় এবং সংস্কারের স্তরে কর্ম সংঘটিত হয়। কিন্তু আত্মা চৈতন্যস্বরূপ। তাই নিবদ্ধ শব্দটি আত্মার চূড়ান্ত বন্ধনকে বোঝায় না। বরং অজ্ঞতার কারণে ব্যক্তি যখন নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপকে শরীর ও মনের সঙ্গে এক করে দেখে তখনই সে কর্মের বন্ধন অনুভব করে। আত্মজ্ঞান অর্জনের অর্থ কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং কে কর্ম করছে, কেন কর্ম করছে এবং কর্মের সঙ্গে নিজের প্রকৃত পরিচয়ের সম্পর্ক কী তা উপলব্ধি করা।
এই শ্লোক কর্মযোগের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। কর্মযোগের শিক্ষা হলো কর্ম থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং কর্মের মধ্যে থেকেও আসক্তি অতিক্রম করা। অর্জুন যদি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে চলে যান, তাহলে বাহ্যিকভাবে তিনি যুদ্ধ এড়াতে পারেন, কিন্তু তার অন্তর্গত দ্বন্দ্ব ও কর্তব্যের প্রশ্ন থেকে মুক্ত হতে পারবেন না। তাই কৃষ্ণ তাকে কর্মের মুখোমুখি দাঁড়াতে বলছেন। কিন্তু সেই কর্ম যেন ব্যক্তিগত অহংকার, ক্রোধ বা ফলের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা পরিচালিত না হয়। নিজের কর্তব্যকে জ্ঞানের আলোয় দেখে অনাসক্তভাবে সম্পাদন করাই কর্মযোগের পথ।
এই শ্লোকের মধ্যে স্বধর্মের ধারণারও গভীর প্রতিফলন রয়েছে। প্রত্যেক মানুষের জীবনে কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্ম তার প্রকৃতি, যোগ্যতা এবং অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যের পথ অনুকরণ করে নিজের প্রকৃতিকে অস্বীকার করলে বাহ্যিক সাফল্য পাওয়া গেলেও অন্তর্গত সামঞ্জস্য নষ্ট হতে পারে। তাই গীতার দৃষ্টিতে নিজের প্রকৃতিকে বোঝা এবং সেই অনুযায়ী কর্তব্য পালন করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে স্বধর্মের অর্থ কোনো সংকীর্ণ সামাজিক পরিচয়ে আবদ্ধ হওয়া নয়। গভীর অর্থে এটি নিজের প্রকৃতি, সামর্থ্য, দায়িত্ব এবং জীবনের নৈতিক আহ্বানকে উপলব্ধি করার বিষয়।
প্রতীকী অর্থে স্বভাবকে নদীর প্রবাহের সঙ্গে তুলনা করা যায়। নদীর জলকে সাময়িকভাবে বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা যায়, কিন্তু তার প্রবাহের শক্তি সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না। মানুষের প্রকৃতিও তেমন। তার মধ্যে কিছু গভীর প্রবণতা থাকে যা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রকাশ পেতে চায়। মোহ হলো কুয়াশার মতো। কুয়াশা থাকলে মানুষ সামনে থাকা পথ স্পষ্ট দেখতে পায় না। কিন্তু কুয়াশা কেটে গেলে পথ আবার পরিষ্কার হয়। তেমনি আত্মজ্ঞান ও বিবেকের আলো মানুষের মোহকে দূর করে তার প্রকৃতি ও কর্তব্যকে স্পষ্ট করে তুলতে পারে।
মানবজীবনে এই শিক্ষার ব্যবহার অত্যন্ত ব্যাপক। একজন মানুষের মধ্যে যদি কোনো বিশেষ প্রতিভা থাকে এবং সে দীর্ঘদিন তা অস্বীকার করে, তাহলে তার মধ্যে এক ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। একজন শিক্ষক হয়তো শিক্ষা দেওয়ার মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পান। একজন গবেষক সত্য অনুসন্ধানে নিজেকে স্বাভাবিকভাবে নিবেদিত করেন। একজন শিল্পী সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের অন্তর্জগত প্রকাশ করেন। একজন সেবাপ্রবণ মানুষ অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে স্বাভাবিক আনন্দ অনুভব করেন। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে মানুষের প্রকৃতি তার কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তবে এর সঙ্গে আত্মজ্ঞান যুক্ত না হলে স্বভাবও আসক্তি বা অহংকারের কারণ হতে পারে। তাই শুধু নিজের স্বভাবকে অনুসরণ করাই যথেষ্ট নয়। নিজের স্বভাবকে জ্ঞান, নৈতিকতা এবং আত্মসচেতনতার দ্বারা পরিশুদ্ধ করাও জরুরি।
এই শ্লোক আমাদের নিজের জীবনকে নতুনভাবে দেখার শিক্ষা দেয়। আমরা প্রায়ই বলি আমি এমনই, আমি এভাবেই করি, আমি এটা করতে পারি না বা আমি এটা করতে চাই না। কিন্তু গীতা আমাদের আরও গভীরভাবে প্রশ্ন করতে শেখায়। আমি যে এমন, তার কারণ কী। এটি কি আমার প্রকৃত স্বভাব, নাকি বহুদিনের অভ্যাস। আমি যে কাজটি করতে চাই না, তা কি সত্যিই আমার অন্তরের সিদ্ধান্ত, নাকি ভয় ও মোহের ফল। আমার ইচ্ছা কি সচেতন জ্ঞানের ফল, নাকি কোনো অদৃশ্য সংস্কারের প্রভাব। এই আত্মঅনুসন্ধান মানুষের জীবনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে।
শ্লোকটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো নিজের প্রকৃতিকে অস্বীকার করে মুক্তি পাওয়া যায় না। আবার নিজের প্রবৃত্তির অন্ধ অনুসরণ করেও মুক্তি পাওয়া যায় না। প্রথমে নিজের প্রকৃতিকে জানতে হবে। তারপর নিজের মোহকে চিনতে হবে। এরপর নিজের কর্তব্যকে উপলব্ধি করতে হবে এবং সেই কর্মকে জ্ঞান ও অনাসক্তির সঙ্গে সম্পাদন করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় মানুষ ধীরে ধীরে কর্মের দাসত্ব থেকে কর্মের সাধনার দিকে এগিয়ে যায়।
অতএব স্বভাবজেন কৌন্তেয় নিবদ্ধঃ স্বেন কর্মণা এই শ্লোকের গভীরে মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি চিরন্তন সত্য রয়েছে। মানুষ তার স্বভাব, সংস্কার ও কর্মের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মোহ তার দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করতে পারে এবং তাকে নিজের কর্তব্য থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু নিজের গভীর প্রকৃতি ও কর্তব্যের সত্যকে উপলব্ধি করলে সেই মানুষ আবার নিজের যথার্থ পথে ফিরে আসতে পারে। গীতার শিক্ষা তাই অন্ধ নিয়তিবাদ নয় এবং সীমাহীন ব্যক্তিস্বাধীনতার দাবিও নয়। এটি মানুষের প্রকৃতি ও স্বাধীনতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য নির্দেশ করে। অজ্ঞ মানুষ নিজের প্রবৃত্তির দ্বারা চালিত হয়, কিন্তু জ্ঞানী মানুষ নিজের প্রবৃত্তিকে জেনে তার সঙ্গে সচেতনভাবে সম্পর্ক স্থাপন করে।
সবশেষে বলা যায়, এই শ্লোক আমাদের একটি গভীর আত্মজিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করায়। মানুষ শুধু তার তাৎক্ষণিক ইচ্ছা নয়, শুধু তার অভ্যাস নয় এবং শুধু তার সামাজিক পরিচয়ও নয়। তার মধ্যে রয়েছে এক গভীরতর প্রকৃতি, যা তার কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে চায়। মোহ সেই সত্যকে আচ্ছন্ন করতে পারে। কিন্তু জ্ঞান সেই আচ্ছাদন সরিয়ে দেয়। তখন কর্ম আর কেবল বাধ্যতামূলক কাজ থাকে না। কর্ম হয়ে ওঠে আত্মপরিচয়ের প্রকাশ, কর্তব্যের সাধনা এবং আধ্যাত্মিক অগ্রগতির একটি পথ। এই কারণেই গীতার এই শ্লোক শুধু অর্জুনের জন্য উচ্চারিত একটি উপদেশ নয়। এটি প্রত্যেক মানুষের জন্য একটি গভীর আহ্বান। নিজের স্বভাবকে জানো, নিজের মোহকে চিনো, নিজের কর্তব্যকে উপলব্ধি করো এবং জ্ঞানের আলোয় নিজের কর্মকে সম্পাদন করো। এই উপলব্ধির মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের প্রকৃত স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হতে পারে।
ভগবদ্গীতা ১৮.৬১ — হৃদয়ে ঈশ্বরের অবস্থান, মায়া ও জীবনের পরিচালনার গভীর তত্ত্ব
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!