ভগবদ্গীতা ১৮.৬১ — হৃদয়ে ঈশ্বরের অবস্থান, মায়া ও জীবনের পরিচালনার গভীর তত্ত্ব
ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি।
ভ্রাময়ন্ সর্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া।।৬১।।
অনুবাদঃ হে অর্জুন! পরমেশ্বর ভগবান সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থান করছেন এবং সমস্ত জীবকে দেহরূপ যন্ত্রে আরোহণ করিয়ে মায়ার দ্বারা ভ্রমণ করান।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের একষট্টিতম শ্লোক মানবজীবন, ঈশ্বর, প্রকৃতি, কর্ম এবং মায়ার সম্পর্ককে এক অসাধারণ গভীরতায় প্রকাশ করেছে। শ্লোকটি হলো ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি। ভ্রাময়ন্ সর্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া। এর সরল অর্থ হলো হে অর্জুন, ঈশ্বর সমস্ত জীবের হৃদয়ের অন্তর্দেশে অবস্থান করেন এবং মায়ার মাধ্যমে যন্ত্রে আরোহণকারী সমস্ত জীবকে পরিচালিত করেন। কিন্তু এই অনুবাদ কেবল শ্লোকটির বাহ্যিক অর্থ প্রকাশ করে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করতে হলে ঈশ্বর, হৃদ্দেশ, তিষ্ঠতি, ভ্রাময়ন্, যন্ত্রারূঢ়ানি এবং মায়য়া এই প্রতিটি শব্দের গভীরে প্রবেশ করতে হয়। কারণ প্রতিটি শব্দের মধ্যেই ভারতীয় দর্শনের একটি বিশাল ভাবজগৎ নিহিত রয়েছে।
ঈশ্বর শব্দটি সংস্কৃত ঈশ্ ধাতু থেকে উদ্ভূত। ঈশ্ ধাতুর অর্থ শাসন করা, অধিকার করা, নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রভুত্ব করা। সেই অর্থে ঈশ্বর হলেন যিনি সর্বোচ্চ অধিকারী এবং যিনি সমগ্র অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত নিয়ামক। কিন্তু গীতার এই শ্লোকে ঈশ্বরকে কেবল দূরবর্তী কোনো সৃষ্টিকর্তা বা স্বর্গে অবস্থানকারী কোনো দেবসত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। এখানে ঈশ্বরকে বলা হয়েছে সর্বভূতানাং হৃদ্দেশে তিষ্ঠতি। অর্থাৎ তিনি সমস্ত জীবের হৃদয়ের অন্তর্দেশে অবস্থান করেন। এই বক্তব্য ঈশ্বরের ধারণাকে বাহ্যিক জগত থেকে মানুষের অন্তর্জগতের দিকে নিয়ে আসে। মানুষ ঈশ্বরকে শুধু মহাবিশ্বের বাইরে খুঁজবে না, নিজের অস্তিত্বের গভীরতম স্তরেও তাঁকে অনুসন্ধান করবে। ঈশ্বর এখানে একই সঙ্গে সর্বব্যাপী এবং অন্তর্যামী। তিনি দূরে নন, আবার কেবল ব্যক্তিমানুষের সীমিত সত্তার মধ্যেও আবদ্ধ নন।
সর্বভূতানাং শব্দটির মধ্যেও একটি গভীর সার্বজনীনতা রয়েছে। সর্ব অর্থ সকল বা সমস্ত এবং ভূত শব্দটি ভূ ধাতু থেকে এসেছে যার অর্থ হওয়া বা অস্তিত্ব লাভ করা। তাই ভূত বলতে অস্তিত্বশীল জীব বা সত্তাকে বোঝানো হয়। সর্বভূতানাং অর্থ সমস্ত জীবের বা সকল অস্তিত্বশীল সত্তার। এই শব্দের মাধ্যমে গীতা ঈশ্বরের উপস্থিতিকে কোনো বিশেষ জাতি, সম্প্রদায়, ধর্ম, দেশ বা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না। মানুষ, প্রাণী এবং সমস্ত জীবনের অন্তরেই সেই পরম নিয়ামকের উপস্থিতি রয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানবজীবনে গভীর নৈতিক তাৎপর্য সৃষ্টি করে। যদি প্রত্যেক জীবের অন্তরে পরম সত্তার উপস্থিতি থাকে, তাহলে অন্য জীবের প্রতি অবজ্ঞা, নিষ্ঠুরতা এবং অহংকারের কোনো স্থায়ী ভিত্তি থাকতে পারে না।
হৃদ্দেশে শব্দটি এই শ্লোকের অন্যতম গভীরতম পদ। হৃৎ অর্থ হৃদয় এবং দেশ অর্থ স্থান বা অঞ্চল। তাই হৃদ্দেশে অর্থ হৃদয়ের অন্তর্দেশে বা অন্তরের গভীরতম স্থানে। তবে এখানে হৃদয়কে কেবল শারীরিক অঙ্গ হিসেবে বোঝা উচিত নয়। ভারতীয় দর্শনে হৃদয় অনেক সময় মানুষের অন্তঃকরণ, অনুভূতি, চেতনা এবং আত্মসচেতনতার প্রতীক। তাই হৃদ্দেশে বলতে মানুষের অস্তিত্বের সেই অন্তর্গত ক্ষেত্রকে বোঝানো যায় যেখানে তার সবচেয়ে গভীর অনুভূতি, চেতনা এবং আত্মসত্তার অভিজ্ঞতা নিহিত। এই কারণে শ্লোকটি মানুষের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানকে বাহ্যিক জগত থেকে অন্তর্জগতের দিকে ফিরিয়ে দেয়। মানুষ যখন প্রশ্ন করে ঈশ্বর কোথায়, তখন গীতার উত্তর হলো হৃদয়ের অন্তর্দেশে।
তিষ্ঠতি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত স্থা ধাতু থেকে যার অর্থ দাঁড়ানো, অবস্থান করা বা স্থিত থাকা। তিষ্ঠতি অর্থ তিনি অবস্থান করেন বা স্থিত থাকেন। এই শব্দটি ঈশ্বরের উপস্থিতির প্রকৃতি বোঝাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈশ্বর জীবের মধ্যে সাময়িকভাবে প্রবেশ করেন এমন নয়, বরং তিনি সেখানে অবস্থান করেন। জীবের অস্তিত্বের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর এবং অন্তর্নিহিত। এই ধারণা ঈশ্বরকে কোনো বাহ্যিক শক্তি হিসেবে দেখার পরিবর্তে অন্তর্যামী হিসেবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতার অন্তরালে যে চেতনা আমাদের অস্তিত্বকে ধারণ করে, সেই গভীর উপস্থিতির প্রতিই এই শ্লোক ইঙ্গিত করে।
এরপর আসে ভ্রাময়ন্ শব্দটি। এটি ভ্রম্ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত যার অর্থ ঘোরা, বিচরণ করা বা ঘুরে বেড়ানো। এর প্রয়োগগত অর্থ হলো ঘোরানো, চলমান রাখা বা বিভিন্ন অবস্থার মধ্য দিয়ে পরিচালিত করা। এই শব্দটি অনেক সময় ভুলভাবে এমন অর্থে নেওয়া হয় যে ঈশ্বর মানুষকে পুতুলের মতো চালান এবং মানুষের নিজের কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু গীতার সামগ্রিক দর্শনের আলোকে এই ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ। গীতা একই সঙ্গে মানুষকে কর্ম করতে, নিজের কর্তব্য পালন করতে, বুদ্ধিকে শুদ্ধ করতে, আসক্তি ত্যাগ করতে এবং আত্মজ্ঞান অর্জন করতে আহ্বান জানায়। অতএব ভ্রাময়ন্ শব্দটি মানুষের জীবনকে একটি বৃহত্তর বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে চলমান থাকার ধারণাকে প্রকাশ করে। জীব তার প্রকৃতি, কর্ম, সংস্কার এবং পরিবেশের প্রভাবে কাজ করে এবং এই সমগ্র ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত নিয়ামক হিসেবে ঈশ্বর অবস্থান করেন।
যন্ত্রারূঢ়ানি শব্দটি শ্লোকটির আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। যন্ত্র অর্থ উপকরণ, ব্যবস্থা বা যন্ত্র এবং আরূঢ় অর্থ আরোহণকারী বা কোনো কিছুর উপর অবস্থানকারী। যন্ত্রারূঢ়ানি তাই যন্ত্রে আরোহণকারী বা যন্ত্রের উপর অবস্থানকারী। এখানে যন্ত্রকে শুধু কোনো ধাতব মেশিন হিসেবে বোঝানো উচিত নয়। মানবদেহ, ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধি, প্রবৃত্তি, সংস্কার এবং প্রকৃতির সমগ্র কার্যব্যবস্থাকে প্রতীকীভাবে একটি যন্ত্র হিসেবে দেখা যায়। মানুষ এই দেহ ও মনকে ব্যবহার করে জগতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে, অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং কর্ম সম্পাদন করে। এই অর্থে দেহ ও মন মানুষের জীবনের বাহন বা যন্ত্র।
মানুষ প্রায়ই মনে করে সে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। কিন্তু তার সিদ্ধান্তের পেছনে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা, অভ্যাস, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, প্রবৃত্তি, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক পরিস্থিতি এবং মানসিক সংস্কার কাজ করে। সে নিজের সিদ্ধান্তকে স্বাধীন মনে করলেও অনেক অদৃশ্য শক্তি তার আচরণকে প্রভাবিত করে। এই বাস্তবতাকে যন্ত্রারূঢ়ানি ধারণার সঙ্গে তুলনা করা যায়। মানুষ একটি জটিল দেহ ও মন ব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান করে এবং সেই ব্যবস্থার সীমা ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়েই তার জীবন পরিচালিত হয়।
মায়য়া শব্দটি এই সমগ্র ব্যবস্থাকে আরও গভীর অর্থ দেয়। মায়া ভারতীয় দর্শনের একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুস্তরীয় ধারণা। সাধারণভাবে মায়াকে ভ্রম বলা হলেও গীতার প্রেক্ষাপটে তাকে শুধু ভ্রম হিসেবে সীমাবদ্ধ করা যায় না। মায়া প্রকৃতির প্রকাশশক্তি, নাম ও রূপের জগৎ, সীমাবদ্ধতার ব্যবস্থা এবং এমন এক শক্তি যার মাধ্যমে পরম সত্য বহুরূপী জগত হিসেবে প্রকাশিত হয়। মায়য়া অর্থ মায়ার দ্বারা বা মায়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ জীব যে দেহ, মন, প্রকৃতি, কর্ম এবং পরিবর্তনশীল জগতের মধ্যে অবস্থান করে তার সঙ্গে মায়ার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রশ্ন হলো ঈশ্বর যদি জীবকে পরিচালিত করেন তাহলে মানুষের স্বাধীনতা কোথায়। গীতার উত্তর সরল নিয়তিবাদ নয়। ঈশ্বরের নিয়ামকতা এবং মানুষের নৈতিক দায়িত্বকে একই কাঠামোর মধ্যে দেখতে হবে। মানুষ প্রকৃতি ও কর্মের প্রভাবে পরিচালিত হলেও তাকে নিজের বুদ্ধি ব্যবহার করতে হয়। তাকে নিজের কর্তব্য পালন করতে হয়। তাকে আসক্তি ত্যাগ করতে হয়। তাকে সত্য উপলব্ধির দিকে এগিয়ে যেতে হয়। অতএব ঈশ্বরের উপস্থিতি মানুষের দায়িত্বকে বাতিল করে না। বরং মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। মানুষ কর্ম করবে কিন্তু নিজেকে সমস্ত কর্মের একমাত্র এবং সর্বশক্তিমান কর্তা মনে করবে না।
অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। অদ্বৈত মতে পরম সত্য ব্রহ্ম এবং জীবের পৃথকত্ব মূলত উপাধি ও মায়ার কারণে প্রতীয়মান। দেহ আলাদা, মন আলাদা এবং ব্যক্তিত্ব আলাদা হলেও চৈতন্যের মূল সত্য এক। এই দৃষ্টিতে হৃদ্দেশে অবস্থানকারী ঈশ্বর মানুষের অন্তর্গত চৈতন্যের গভীরতম সত্যের দিকে নির্দেশ করেন। মানুষ যখন নিজের দেহ ও মানসিক পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে আত্মস্বরূপ অনুসন্ধান করে তখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে তার অস্তিত্বের গভীরে একটি বৃহত্তর চৈতন্য সত্য রয়েছে।
ভগবদ্গীতা ১৮.৬২ — সর্বভাবের আত্মসমর্পণ, ঈশ্বরের কৃপা ও পরম শান্তির পথে
বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীবের সম্পর্ক আরও ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। ঈশ্বর সর্বাধার এবং জীব তাঁর ওপর নির্ভরশীল। ঈশ্বর জীবের অন্তরে অবস্থান করেন এবং জীবকে ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু জীব ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও সম্পূর্ণভাবে ঈশ্বরের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যায় না। এখানে হৃদ্দেশে শব্দটি ঈশ্বরের অন্তর্যামী স্বরূপকে প্রকাশ করে। তিনি জীবের নিকটতম সত্য এবং একই সঙ্গে জীবের ঊর্ধ্বে পরম সত্য।
দ্বৈত দর্শনে ঈশ্বর ও জীব পৃথক সত্তা। ঈশ্বর সর্বোচ্চ নিয়ন্তা এবং জীব তাঁর ওপর নির্ভরশীল। তাই ঈশ্বর হৃদয়ে অবস্থান করলেও তিনি জীবের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যান না। এই ব্যাখ্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অন্তরে ঈশ্বরের উপস্থিতি মানে মানুষ নিজেই ঈশ্বর হয়ে গেছে এমন নয়। বরং এর অর্থ হলো জীবের অস্তিত্ব ঈশ্বরের উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল।
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের গভীর প্রতীকী মূল্য রয়েছে। মানুষের আচরণ কেবল সচেতন সিদ্ধান্তের ফল নয়। তার অবচেতন প্রবণতা, অভ্যাস, পূর্ব অভিজ্ঞতা, ভয়, আকাঙ্ক্ষা এবং পরিবেশ তার আচরণকে প্রভাবিত করে। মানুষ অনেক সময় নিজের সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলে মনে করলেও তার অন্তরে বহু অদৃশ্য প্রবণতা কাজ করে। এই দৃষ্টিতে যন্ত্রারূঢ়ানি মানুষের দেহ ও মনকে একটি জটিল কার্যব্যবস্থা হিসেবে বোঝার সুযোগ দেয়। আর হৃদ্দেশে মানুষের অন্তর্গত চেতনা ও আত্মসচেতনতার দিকে ইঙ্গিত করে।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতেও শ্লোকটি অত্যন্ত সুন্দর। একদিকে আছে হৃদয়ের অন্তর্দেশ এবং অন্যদিকে আছে যন্ত্রে আরোহণকারী জীব। একদিকে অন্তরের গভীরে ঈশ্বরের অবস্থান এবং অন্যদিকে প্রকৃতির গতিশীল যন্ত্রের মধ্যে জীবের অবস্থান। এই দ্বৈত চিত্র মানবজীবনের একটি গভীর সত্যকে প্রকাশ করে। মানুষ বাহ্যিক জগতে কর্মরত, পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার অন্তরের গভীরে এমন একটি স্থির সত্য আছে যা পরিবর্তনের অতীত। বাহ্যিক জীবন চলমান অথচ অন্তরের পরম সত্য স্থিত।
এই শ্লোক মানবজীবনে বিনয় ও আত্মঅনুসন্ধানের শিক্ষা দেয়। মানুষ যখন নিজেকে সমস্ত ক্ষমতার একমাত্র উৎস মনে করে তখন অহংকার জন্ম নেয়। কিন্তু যখন সে উপলব্ধি করে যে তার জীবন একটি বৃহত্তর অস্তিত্বব্যবস্থার অংশ এবং তার অন্তরে এক পরম নিয়ামক উপস্থিত, তখন তার মধ্যে বিনয় জন্মায়। আবার ঈশ্বর সবকিছু করছেন বলে নিজের কর্তব্য থেকে পালিয়ে যাওয়াও গীতার শিক্ষা নয়। বরং মানুষকে নিজের কর্ম যথাযথভাবে করতে হবে এবং কর্মের ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করতে হবে। এই ভারসাম্যই গীতার কর্মদর্শনের অন্যতম সৌন্দর্য।
একটি সহজ উপমার মাধ্যমে বিষয়টি বোঝা যায়। একটি গাড়ির মধ্যে চালক, ইঞ্জিন, চাকা এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। গাড়িটি নিজে কোনো উদ্দেশ্য স্থির করে না। তার চলার পেছনে একটি বৃহত্তর ব্যবস্থা থাকে। তেমনি মানবদেহ ও মন একটি যন্ত্রের মতো কাজ করে। ইন্দ্রিয় বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করে, মন অভিজ্ঞতা গ্রহণ করে, বুদ্ধি বিচার করে এবং দেহ কর্ম সম্পাদন করে। কিন্তু এই সমগ্র ব্যবস্থার অন্তরালে যে চৈতন্য মানুষের অভিজ্ঞতাকে সম্ভব করে তোলে এবং যে পরম সত্য সমগ্র অস্তিত্বকে ধারণ করে, গীতা সেই সত্যের দিকে ঈশ্বর শব্দের মাধ্যমে ইঙ্গিত করে।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো ঈশ্বরকে খুঁজতে হলে মানুষের নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে হবে। মানুষ সাধারণত ঈশ্বরকে বাহ্যিক কোনো স্থান, প্রতিমা, আকাশ বা দূরবর্তী জগতের মধ্যে খোঁজে। কিন্তু গীতা বলে হৃদ্দেশে। অর্থাৎ মানুষের অন্তরের গভীরতম স্থানে সেই পরম সত্যের উপস্থিতি রয়েছে। বাহ্যিক সাধনা তখন অন্তর্গত উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। মানুষ নিজের মন, অহংকার, আকাঙ্ক্ষা এবং সীমাবদ্ধতার স্তর অতিক্রম করে নিজের অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করলে সেই অন্তর্যামী সত্যকে উপলব্ধি করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
এই উপলব্ধি মানুষের জীবনে এক গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। তখন অন্য মানুষের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। সে বুঝতে পারে যে প্রত্যেক জীবের অন্তরে একই পরম সত্যের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে অহংকারের পরিবর্তে বিনয়, ঘৃণার পরিবর্তে সহমর্মিতা এবং বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে ঐক্যের অনুভূতি জন্ম নিতে পারে। এই কারণেই শ্লোকটি কেবল ঈশ্বরতত্ত্বের আলোচনা নয়। এটি মানবনৈতিকতারও একটি গভীর ভিত্তি।
সবশেষে বলা যায়, ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি এই শ্লোকটি মানুষের অস্তিত্বকে তিনটি গভীর স্তরে দেখতে শেখায়। একদিকে আছে ঈশ্বর যিনি পরম নিয়ামক। অন্যদিকে আছে জীব যে দেহ, মন, ইন্দ্রিয়, কর্ম ও প্রকৃতির ব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান করে। আর এই সমগ্র ব্যবস্থার মধ্যস্থ শক্তি হিসেবে রয়েছে মায়া যা নাম, রূপ, প্রকৃতি ও সীমাবদ্ধতার জগৎকে প্রকাশ করে। শ্লোকটির প্রকৃত তাৎপর্য তাই কেবল এই নয় যে ঈশ্বর জীবকে পরিচালনা করেন। এর গভীরতর অর্থ হলো মানুষ কখনোই অস্তিত্বের একাকী ও বিচ্ছিন্ন কেন্দ্র নয়। তার অন্তরে এক পরম উপস্থিতি রয়েছে এবং তার জীবন একটি বৃহত্তর বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। বাহ্যিক জগতের চলমানতার মধ্যেও অন্তরের গভীরে একটি স্থির সত্য অবস্থান করে। সেই সত্যকে উপলব্ধি করা, নিজের প্রকৃতি ও কর্মকে বোঝা এবং অহংকারের সীমা অতিক্রম করে অন্তর্যামী ঈশ্বরের দিকে ফিরে যাওয়াই এই শ্লোকের আধ্যাত্মিক আহ্বান। মানুষের সত্যিকারের যাত্রা তাই কেবল বাহিরের পৃথিবী জয় করার যাত্রা নয়। এটি নিজের অন্তরের গভীরে অবস্থিত সেই পরম সত্যকে আবিষ্কার করার যাত্রা।
ভগবদ্গীতা ১৮.৬২ — সর্বভাবের আত্মসমর্পণ, ঈশ্বরের কৃপা ও পরম শান্তির পথে
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!