সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.৬৯ — গীতাজ্ঞান প্রচারের মহিমা, ভক্তিসেবা ও ঈশ্বরের পরম প্রিয় হওয়ার পথ

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
ন চ তস্মাম্মনুষ্যেষু কশ্চিন্মে প্রিয়কৃত্তমঃ। ভবিতা ন চ মে তস্মাদন্যঃ প্রিয়তরো ভুুবি।।৬৯।।
ন চ তস্মাম্মনুষ্যেষু কশ্চিন্মে প্রিয়কৃত্তমঃ। 
ভবিতা ন চ মে তস্মাদন্যঃ প্রিয়তরো ভুুবি।।৬৯।।

অনুবাদঃ এই পৃথিবীতে মানুষদের মধ্যে তাঁর থেকে অধিক প্রিয়কারী আমার কেউ নেই এবং তাঁর থেকে অন্য কেউ আমার প্রিয়তর হবে না।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ঊনসত্তরতম শ্লোকটি গীতার সমগ্র শিক্ষার এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরিণতি প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে এমন একজন মানুষের মহিমা ঘোষণা করেছেন, যিনি ভক্তিভরে গীতার গভীর তত্ত্ব অন্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেন এবং তাদের আত্মিক উন্নতির পথে পরিচালিত করেন। শ্লোকটি হলো “ন চ তস্মান্মনুষ্যেষু কশ্চিন্মে প্রিয়কৃত্তমঃ ভবিতা ন চ মে তস্মাদন্যঃ প্রিয়তরো ভুবি”। এর সরল অর্থ হলো মানুষের মধ্যে তার চেয়ে আমার অধিক প্রিয়কর কর্মকারী আর কেউ নেই এবং পৃথিবীতে তার চেয়ে অধিক প্রিয়তর অন্য কেউ ভবিষ্যতেও হবে না। এই বক্তব্যের মধ্যে শুধু একজন ধর্মশিক্ষকের প্রশংসা নেই, বরং জ্ঞান, ভক্তি, সেবা, মানবকল্যাণ এবং ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক গভীর দর্শন নিহিত রয়েছে।

এই শ্লোকের কেন্দ্রীয় শব্দ হলো প্রিয়কৃত্তমঃ। শব্দটির গভীরে প্রবেশ করলে এর তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রিয় শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত প্রী ধাতুর সম্পর্ক রয়েছে। প্রী ধাতুর মূল ভাব হলো আনন্দিত করা, সন্তুষ্ট করা এবং প্রীত করা। সেই অর্থে প্রিয় বলতে বোঝায় যা হৃদয়ে আনন্দ বা প্রীতি সৃষ্টি করে এবং যাকে ভালোবাসা যায়। অন্যদিকে কৃত্ শব্দটি কৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃ ধাতুর অর্থ করা, সম্পাদন করা বা কোনো কাজ সম্পন্ন করা। ফলে প্রিয় এবং কৃত্ মিলিত হয়ে প্রিয়কৃত্ এমন অর্থ প্রকাশ করে যার দ্বারা প্রিয় বা প্রীতিকর কাজ সম্পাদন করা বোঝায়। এর সঙ্গে তম প্রত্যয় যুক্ত হলে সর্বোচ্চতার অর্থ প্রকাশিত হয়। তাই প্রিয়কৃত্তমঃ বলতে বোঝায় যিনি সর্বাধিক প্রীতিকর বা সর্বোচ্চ সন্তোষজনক কর্ম সম্পাদন করেন। এটি কেবল প্রিয় ব্যক্তি বোঝায় না। বরং এমন একজনকে বোঝায় যার কর্ম ঈশ্বরের কাছে সর্বাধিক সন্তোষজনক।

এই শব্দটির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। প্রিয় মানে যাকে ভালোবাসা হয়। প্রিয়তর মানে যিনি অধিক প্রিয়। কিন্তু প্রিয়কৃত্তমঃ মানে যিনি সর্বাধিক প্রিয়কর কাজ করেন। অর্থাৎ এখানে ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসার চেয়ে তার কর্মের মাহাত্ম্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ এমন ব্যক্তির কথা বলছেন যিনি নিজের মধ্যে আধ্যাত্মিক জ্ঞান ধরে রাখেন না বরং তা ভক্তি ও বিবেচনার সঙ্গে অন্য মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করেন। এই কারণেই প্রিয়কৃত্তমঃ শব্দটি গীতার কর্মযোগ এবং ভক্তিযোগের একটি সুন্দর সমন্বয় প্রকাশ করে।

ভগবদ্গীতা ১৮.৭০ — গীতার ধর্মময় সংলাপ অধ্যয়ন ও জ্ঞানযজ্ঞের মাধ্যমে ঈশ্বরোপাসনা

শ্লোকের মনুষ্যেষু শব্দের অর্থ মানুষের মধ্যে। মনুষ্য শব্দের বহুবচন রূপের মাধ্যমে সমগ্র মানবসমাজকে বোঝানো হয়েছে। এর ফলে শ্লোকটির বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। মানুষের সমাজে যে ব্যক্তি সত্য ও আত্মজ্ঞানকে ধারণ করে এবং অন্যদেরও সেই জ্ঞান উপলব্ধি করতে সাহায্য করে, তার কর্ম বিশেষভাবে মূল্যবান। এখানে মানবজীবনের একটি মৌলিক দায়িত্বের কথাও ইঙ্গিত করা হয়েছে। মানুষ শুধু নিজের উন্নতির জন্য জ্ঞান অর্জন করবে না। নিজের উপলব্ধি যদি অন্যের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তবে সেই জ্ঞান আরও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মে শব্দের অর্থ আমার বা আমার কাছে। এই ছোট্ট শব্দটি শ্লোকের সম্পর্কগত দিকটি প্রকাশ করে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে কোনো নিরপেক্ষ নৈতিক পুরস্কারের কথা বলছেন না। তিনি নিজেই বলছেন যে এই ধরনের ব্যক্তি তাঁর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। ফলে এখানে জ্ঞানদান কেবল সামাজিক সেবা নয়। এটি ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনেরও একটি মাধ্যম। যে ব্যক্তি অন্যের অন্তর্জীবনকে উন্নত করতে সাহায্য করে, সে ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে। এই কারণেই তার কর্ম ঈশ্বরের কাছে বিশেষভাবে মূল্যবান।

শ্লোকে ভবিতা শব্দটি ভবিষ্যৎ অর্থ প্রকাশ করে। এর মূল হলো ভূ ধাতু, যার অর্থ হওয়া, অস্তিত্ব লাভ করা বা হয়ে ওঠা। শ্রীকৃষ্ণ শুধু বর্তমানের কথা বলছেন না। তিনি বলেন যে ভবিষ্যতেও তার চেয়ে অধিক প্রিয় কেউ হবে না। এর মাধ্যমে সেই কর্মের শ্রেষ্ঠত্বকে একটি স্থায়ী মূল্য দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে প্রিয়তর শব্দে তর প্রত্যয় অধিকতার অর্থ প্রকাশ করে। অর্থাৎ তার চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কেউ নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। ভুবি শব্দটি পৃথিবীতে বা মানবজগতে অর্থ প্রকাশ করে। ফলে পুরো বক্তব্যটি মানবসমাজের পরিসরে এক সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক মূল্যায়ন হিসেবে উপস্থিত হয়।

এই শ্লোকের প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য এর পূর্ববর্তী শ্লোকগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বোঝা প্রয়োজন। অষ্টাদশ অধ্যায়ের শেষভাগে শ্রীকৃষ্ণ গীতার পরম গুহ্য জ্ঞান কাদের কাছে এবং কীভাবে বলা উচিত সে বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন। তার পরেই বলেছেন যে যে ব্যক্তি ভক্তদের মধ্যে এই জ্ঞান প্রচার করে, সে তাঁকে অত্যন্ত প্রিয়। অর্থাৎ ঊনসত্তরতম শ্লোকটি বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশংসা নয়। এটি পূর্ববর্তী বক্তব্যের স্বাভাবিক পরিণতি। এখানে গীতার জ্ঞানকে মানুষের আত্মিক কল্যাণের জন্য ব্যবহার করার মাহাত্ম্য প্রকাশিত হয়েছে।

এখানে প্রচার শব্দটিকেও গভীর অর্থে বোঝা উচিত। এটি কেবল মুখে কোনো ধর্মীয় বক্তব্য বলা বা তথ্য বিতরণ করা নয়। প্রকৃত অর্থে গীতার শিক্ষা প্রচার করা হলো মানুষের জীবনে আত্মজ্ঞান, কর্তব্যবোধ, সংযম, ভক্তি, বিবেক এবং ঈশ্বরচেতনার বিকাশে সাহায্য করা। একজন প্রকৃত শিক্ষক কেবল তথ্য দেন না। তিনি মানুষের চিন্তার পদ্ধতি পরিবর্তন করতে সাহায্য করেন। তিনি মানুষকে নিজের জীবন, নিজের কর্তব্য, নিজের আসক্তি এবং নিজের অন্তর্গত সত্য সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শেখান। এই অর্থে গীতার জ্ঞান প্রচার একটি গভীর মানবিক এবং আধ্যাত্মিক সেবা।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও শ্লোকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অদ্বৈত বেদান্তের আলোকে দেখলে গীতার জ্ঞান মানুষের অজ্ঞানতা দূর করে আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। এই দৃষ্টিতে যে ব্যক্তি অন্যের আত্মিক অজ্ঞানতা দূর করতে সাহায্য করেন, তিনি মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণে অংশগ্রহণ করেন। কারণ বাহ্যিক জ্ঞান মানুষকে জগতের সঙ্গে সফলভাবে চলতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু আত্মজ্ঞান মানুষকে নিজের অস্তিত্বের গভীরতম সত্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।

বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শনের আলোকে এই শ্লোকের অর্থ আরও সম্পর্কময় হয়ে ওঠে। জীব এবং ঈশ্বরের মধ্যে চিরন্তন সম্পর্ক রয়েছে। গীতার শিক্ষা সেই সম্পর্ককে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং মানুষকে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি ও শরণাগতির পথে নিয়ে যায়। যে ব্যক্তি অন্য মানুষকে এই ঈশ্বরীয় সম্পর্ক উপলব্ধি করতে সাহায্য করেন, তিনি ঈশ্বরের সেবায় অংশগ্রহণ করেন। তাই তাঁর কর্ম ঈশ্বরের কাছে বিশেষভাবে প্রিয় হওয়া স্বাভাবিক।

দ্বৈত দর্শনের আলোকে জীব এবং ঈশ্বর পৃথক সত্তা হলেও জীবের সর্বোচ্চ কল্যাণ ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি ও নির্ভরতার মধ্যে নিহিত। সেই কারণে যে ব্যক্তি অন্যকে ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি এবং শরণাগতির পথে পরিচালিত করেন, তার কর্মকে ঈশ্বরের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে দেখা যায়। ভক্তিবাদের সাধারণ দৃষ্টিতেও একই সত্য প্রকাশিত হয়। যে ব্যক্তি নিজে ঈশ্বরকে ভালোবাসে সে ঈশ্বরের প্রিয়, কিন্তু যে ব্যক্তি অন্য মানুষের হৃদয়ে ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে, সে ঈশ্বরকে আরও গভীরভাবে সন্তুষ্ট করে।

এই শ্লোকের মধ্যে একটি গভীর মানবিক দর্শনও রয়েছে। সাধারণত মানুষ নিজের সুখ, নিজের জ্ঞান এবং নিজের সাফল্যকে কেন্দ্র করে জীবন গড়ে তোলে। কিন্তু গীতা এখানে জীবনের একটি উচ্চতর আদর্শ সামনে রাখছে। সেই আদর্শ হলো নিজের অর্জনকে অন্যের কল্যাণে ব্যবহার করা। একজন মানুষ অনেক জ্ঞান অর্জন করতে পারেন, কিন্তু যদি সেই জ্ঞান শুধু নিজের অহংকার বৃদ্ধি করে তবে তার প্রকৃত মূল্য সীমিত। অন্যদিকে একজন ব্যক্তি যদি নিজের উপলব্ধিকে অন্য মানুষের জীবন আলোকিত করার জন্য ব্যবহার করেন, তবে তার জ্ঞান সেবায় পরিণত হয়। এখানেই জ্ঞান ও ভক্তির মিলন ঘটে।

এই ভাবটিকে একটি প্রদীপের উপমা দিয়ে সহজে বোঝা যায়। একটি প্রদীপ নিজের চারপাশের অন্ধকার দূর করতে পারে। কিন্তু সেই প্রদীপ থেকে যদি আরও অনেক প্রদীপ জ্বালানো হয়, তবে তার নিজের আলো একটুও কমে যায় না। বরং আরও বৃহৎ পরিসরে অন্ধকার দূর হয়। গীতার জ্ঞানও তেমন। একজন মানুষ যখন আত্মজ্ঞান লাভ করেন এবং সেই জ্ঞান অন্য মানুষের অন্তর্জীবনে আলো সৃষ্টি করতে ব্যবহার করেন, তখন তার নিজের উপলব্ধি ক্ষীণ হয় না। বরং জ্ঞানের আলো আরও বিস্তৃত হয়।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মধ্যে শুধু তথ্য জানার প্রয়োজন নেই। তার প্রয়োজন আত্মপর্যবেক্ষণ, অর্থবোধ, মূল্যবোধ এবং অন্তর্গত পরিবর্তন। একজন প্রকৃত শিক্ষক কেবল বলেন না কোনটি সত্য। তিনি মানুষকে সেই সত্য নিজের জীবনে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেন। তথ্য যখন উপলব্ধিতে পরিণত হয়, উপলব্ধি যখন চরিত্রে পরিণত হয় এবং চরিত্র যখন কর্মে প্রকাশ পায়, তখনই প্রকৃত রূপান্তর ঘটে। গীতার জ্ঞান প্রচারের মহিমা এই রূপান্তরের মধ্যেই নিহিত।

শ্লোকটির প্রতীকী অর্থও অত্যন্ত সুন্দর। এখানে গীতার জ্ঞান প্রচারকারী ব্যক্তি এক অর্থে আলোর বাহক। তিনি অজ্ঞতার অন্ধকারে থাকা মানুষের সামনে আত্মজ্ঞান ও সত্যের আলো তুলে ধরেন। তিনি নিজের আধ্যাত্মিক অর্জনকে ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে ধরে রাখেন না। বরং তা মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করেন। এই কারণে তিনি জ্ঞানের বাহক, করুণার বাহক এবং সেবার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

কর্মযোগের সঙ্গেও এই শিক্ষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কর্মযোগ মানুষকে কর্মের প্রতি নিষ্ঠা এবং ফলের প্রতি অনাসক্তির শিক্ষা দেয়। এখানে এমন এক কর্মের কথা বলা হয়েছে যার উদ্দেশ্য অন্যের আত্মিক কল্যাণ। যদি কেউ গীতার শিক্ষা প্রচার করে নিজের খ্যাতি, অর্থ বা ক্ষমতা অর্জনের জন্য, তবে বাহ্যিকভাবে তার কাজ একই মনে হতে পারে, কিন্তু অন্তর্গত উদ্দেশ্য ভিন্ন হয়ে যায়। প্রকৃত গীতাসেবা হলো এমন কর্ম যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সত্য ও মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

এই কারণে শ্লোকটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রাখে। প্রকৃত অর্থে একজন উপকারী মানুষ কে। গীতার আলোকে বলা যায়, শুধু যে নিজে উন্নত হয়েছে সে নয়, বরং যে অন্যকেও উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে সে সত্যিকার অর্থে বৃহত্তর কল্যাণের অংশীদার। নিজের মুক্তি কামনা করা আধ্যাত্মিক সাধনার একটি স্তর হতে পারে। কিন্তু অন্যের আত্মিক জাগরণে সহায়তা করা সেই সাধনাকে সেবার মহত্তর স্তরে উন্নীত করে।

বাস্তব জীবনে এর অসংখ্য উদাহরণ দেখা যায়। একজন শিক্ষক যদি শুধু নিজের জ্ঞান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন তবে তাঁর জ্ঞান সীমিত পরিসরে থাকে। কিন্তু তিনি যদি ছাত্রদের চিন্তা করতে শেখান, সত্য অনুসন্ধান করতে শেখান এবং তাদের চরিত্র গঠনে সাহায্য করেন, তবে তাঁর জ্ঞান বহু জীবনে প্রবাহিত হয়। একজন অভিভাবক যদি শুধু সন্তানকে সম্পদ দিয়ে যান তবে তা এক ধরনের উত্তরাধিকার। কিন্তু যদি তিনি সন্তানকে নৈতিকতা, আত্মসংযম, বিবেক এবং সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা শেখান তবে তিনি তার জীবনে আরও গভীর সম্পদ রেখে যান। এই দৃষ্টিতে গীতার শিক্ষা শুধু ধর্মীয় শিক্ষকের জন্য নয়। যে কোনো মানুষের জন্য প্রযোজ্য, যে নিজের উপলব্ধি অন্যের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়।

এই শ্লোকের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা সম্ভবত হলো যে ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়। প্রকৃত ভক্তি মানুষের আচরণে প্রকাশিত হয়। নিজের হৃদয়ে ঈশ্বরকে ধারণ করা এক বিষয় এবং সেই ঈশ্বরীয় জ্ঞানের আলোয় অন্য মানুষের জীবনকে আলোকিত করার চেষ্টা করা আরেক বিষয়। দ্বিতীয়টি ভক্তিকে কর্মে পরিণত করে। তাই প্রিয়কৃত্তমঃ শব্দটি আসলে ভক্তির একটি কর্মময় আদর্শ প্রকাশ করে।

সমগ্র শ্লোকটিকে একত্রে দেখলে একটি সুন্দর ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। প্রথমে মানুষ গীতার জ্ঞান গ্রহণ করে। তারপর সেই জ্ঞানকে হৃদয়ে ধারণ করে। এরপর সেই উপলব্ধি নিজের জীবনকে পরিবর্তিত করে। তারপর সে অন্য মানুষের কল্যাণে সেই জ্ঞান ব্যবহার করে। এই সেবার মাধ্যমে তার কর্ম ঈশ্বরের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে জ্ঞান ব্যক্তিগত অর্জন থেকে পরমার্থসেবায় উন্নীত হয়। এই কারণেই শ্রীকৃষ্ণ এমন ব্যক্তিকে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক প্রিয়কর কর্মকারী এবং নিজের কাছে সর্বাধিক প্রিয় বলে ঘোষণা করেছেন।

সবশেষে বলা যায়, গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ঊনসত্তরতম শ্লোক মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের একটি অত্যন্ত উচ্চ আদর্শ সামনে আনে। এখানে প্রিয় হওয়ার অর্থ ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জন নয় এবং ঈশ্বরের কাছে প্রিয় হওয়ার অর্থ কোনো বাহ্যিক পুরস্কার লাভ করাও নয়। বরং সত্যকে উপলব্ধি করে সেই সত্যের আলো অন্য মানুষের জীবনে পৌঁছে দেওয়া, অজ্ঞতা দূর করতে সাহায্য করা এবং মানুষের অন্তর্গত কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাই এই শ্লোকের মূল শিক্ষা। প্রিয়কৃত্তমঃ তাই শুধু একটি সংস্কৃত শব্দ নয়। এটি জ্ঞানকে সেবায় রূপান্তরিত করার প্রতীক, ভক্তিকে কর্মে প্রকাশ করার প্রতীক এবং নিজের আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে অন্যের জাগরণের জন্য উৎসর্গ করার প্রতীক। নিজের মধ্যে আলো জ্বালানো আধ্যাত্মিকতার সূচনা হতে পারে, কিন্তু সেই আলো দিয়ে অন্যের পথ আলোকিত করা তার মহত্তর পরিণতি। গীতা ১৮.৬৯ সেই মহত্তর মানবিক ও আধ্যাত্মিক আদর্শকেই ঘোষণা করে।

ভগবদ্গীতা ১৮.৭০ — গীতার ধর্মময় সংলাপ অধ্যয়ন ও জ্ঞানযজ্ঞের মাধ্যমে ঈশ্বরোপাসনা

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 October 13, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি