ভগবদ্গীতা ১৮.৭১ — শ্রদ্ধাপূর্ণ শ্রবণ, অসূয়াহীন মন ও জ্ঞানগ্রহণের মাধ্যমে মুক্তির পথ
শ্রদ্ধাবাননসূয়শ্চ শৃণুয়াদপি যো নরঃ।
সোহপি মুক্তঃ শুভাঁল্লোকান্ প্রাপ্নুয়াৎ পুণ্যকর্মণাম্।।৭১।।
অনুবাদঃ শ্রদ্ধাবান ও অসূয়া-রহিত যে মানুষ গীতা শ্রবণ করেন, তিনিও পাপমুক্ত হয়ে পুণ্য কর্মকারীদের শুভ লোকসমূহ লাভ করেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের একাত্তরতম শ্লোকটি গীতার সমগ্র শিক্ষার একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সমাপ্তিমুখী নির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এখানে শ্রীকৃষ্ণ মানুষের কাছে কেবল গীতার জ্ঞান শ্রবণ করার কথা বলেননি, বরং কী ধরনের মানসিক অবস্থায় সেই জ্ঞান শ্রবণ করতে হবে তারও একটি গভীর নির্দেশ দিয়েছেন। শ্লোকটির মূল বক্তব্য হলো যে মানুষ শ্রদ্ধাবান এবং অসূয়াহীন হয়ে গীতার উপদেশ শ্রবণ করে, সেও মুক্ত হয়ে পুণ্যকর্মীদের শুভ লোকসমূহ লাভ করতে পারে। এই বক্তব্যের মধ্যে জ্ঞান, শ্রদ্ধা, বিনয়, শ্রবণ, আত্মশুদ্ধি এবং মুক্তির এক গভীর সম্পর্ক প্রকাশিত হয়েছে। তাই এই শ্লোককে শুধু একটি ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা যায় না। এটি মানুষের জ্ঞানগ্রহণের প্রকৃতি, মানসিক প্রস্তুতি এবং আধ্যাত্মিক রূপান্তরের একটি গভীর দর্শনও প্রকাশ করে।
শ্লোকটির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো শ্রদ্ধাবান। সংস্কৃত শ্রদ্ধাবান শব্দটি শ্রদ্ধা শব্দের সঙ্গে এমন একটি প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে যার দ্বারা কোনো গুণের অধিকারী ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। শ্রদ্ধাবান অর্থ যার মধ্যে শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু এখানে শ্রদ্ধা বলতে কেবল অন্ধ বিশ্বাস বোঝানো হয় না। শ্রদ্ধা হলো সত্যকে জানার জন্য হৃদয় ও মনকে উন্মুক্ত রাখার একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা। মানুষ যখন মনে করে যে সে সবকিছু জানে, তখন তার কাছে নতুন কোনো জ্ঞান প্রবেশের সুযোগ থাকে না। কিন্তু যখন সে বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করে যে সত্য সম্পর্কে তার জ্ঞান সীমিত এবং সে আরও জানতে প্রস্তুত, তখন তার মধ্যে জ্ঞান গ্রহণের প্রকৃত সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। এই অর্থে শ্রদ্ধা বুদ্ধির বিরোধী নয়। বরং শ্রদ্ধা বুদ্ধিকে সত্য অনুসন্ধানের জন্য প্রস্তুত করে। শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি কোনো বক্তব্যকে অন্ধভাবে গ্রহণ করে না, আবার বিদ্বেষের কারণে তা প্রত্যাখ্যানও করে না। সে সম্মান ও মনোযোগের সঙ্গে শোনে, চিন্তা করে এবং সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করে।
শ্লোকটির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো অনসূয়ঃ। অনসূয়া শব্দের পূর্বে অ অর্থাৎ না অর্থবোধক অংশ যুক্ত হয়েছে। অসূয়া বলতে অন্যের গুণে অসন্তুষ্ট হওয়া, ঈর্ষা করা, বিদ্বেষপূর্ণভাবে দোষ খোঁজা অথবা কোনো মহৎ বক্তব্যকে সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে কেবল ত্রুটি অনুসন্ধানের মানসিকতা নিয়ে বিচার করা বোঝানো হয়। সেই কারণে অনসূয়াহীনতা শুধু ঈর্ষাহীনতার অর্থ বহন করে না। এর গভীরে রয়েছে বিদ্বেষপূর্ণ দোষদৃষ্টি থেকে মুক্ত থাকা। একজন মানুষ প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি দিতে পারে এবং কোনো বক্তব্য নিয়ে সন্দেহও প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু যদি তার উদ্দেশ্য সত্যকে জানা হয়, তাহলে সেই প্রশ্ন অনুসন্ধানের অংশ। অন্যদিকে যদি সে কোনো বক্তব্য গ্রহণ করার আগেই তার মধ্যে ত্রুটি খোঁজার সংকল্প করে বসে, তাহলে তার মন সত্য গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত থাকে না। গীতার এই শ্লোক সেই বিদ্বেষপূর্ণ মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে জ্ঞান শ্রবণের কথা বলে।
শ্রদ্ধা এবং অনসূয়াহীনতাকে পাশাপাশি রাখার মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের গভীর মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ পেয়েছে। শুধু শ্রদ্ধা থাকলেই যথেষ্ট নয়, কারণ শ্রদ্ধা কখনো কখনো অন্ধ বিশ্বাসে পরিণত হতে পারে। আবার শুধু অনসূয়াহীনতাও যথেষ্ট নয়, কারণ কারও মধ্যে বিদ্বেষ না থাকলেও তার মধ্যে জ্ঞান গ্রহণের আগ্রহ নাও থাকতে পারে। তাই শ্রদ্ধা মানুষের হৃদয়কে উন্মুক্ত করে এবং অনসূয়াহীনতা সেই হৃদয়কে বিদ্বেষ ও অহংকারের বিকৃতি থেকে রক্ষা করে। এই দুই গুণ একত্রে থাকলে মানুষ সত্যকে যথাযথভাবে শুনতে পারে। এখানেই শ্লোকটির অন্যতম প্রধান শিক্ষা নিহিত রয়েছে।
এরপর এসেছে শৃণুয়াত্ শব্দটি। এর মূল ধাতু হলো শ্রু, যার অর্থ শোনা বা শ্রবণ করা। সংস্কৃত ঐতিহ্যে শ্রবণ শব্দটির গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। সাধারণভাবে শোনা মানে কানে কোনো শব্দ প্রবেশ করা। কিন্তু আধ্যাত্মিক অর্থে শ্রবণ হলো এমনভাবে শোনা যাতে কথার অন্তর্নিহিত অর্থ হৃদয় ও বুদ্ধির কাছে পৌঁছায়। একজন মানুষ একই কথা শুনেও তা বুঝতে পারে না, আবার অন্য একজন একই কথার মধ্যে নিজের জীবনের জন্য গভীর শিক্ষা খুঁজে পেতে পারে। পার্থক্যটি শুধু শব্দের মধ্যে নয়, শ্রোতার মানসিক প্রস্তুতির মধ্যেও রয়েছে। তাই গীতার ক্ষেত্রে শ্রবণ একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন। শোনা, চিন্তা করা এবং উপলব্ধির মাধ্যমে শাস্ত্রের জ্ঞান ধীরে ধীরে মানুষের চেতনার অংশ হয়ে ওঠে।
শ্লোকে অপি শব্দটির ব্যবহারও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ সেও বা এমনকি সেও। অর্থাৎ যে ব্যক্তি এখনও সম্পূর্ণ জ্ঞানী হয়ে ওঠেনি, যে নিজে কোনো দীর্ঘ সাধনা সম্পন্ন করেনি, সেও যদি শ্রদ্ধা ও অসূয়াহীনতার সঙ্গে গীতার শিক্ষা শ্রবণ করে, তবে সে কল্যাণ লাভ করতে পারে। এখানে একটি গভীর আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য মানুষের অতীত অবস্থাই চূড়ান্ত নয়। একজন সাধারণ মানুষও সঠিক মানসিকতা নিয়ে সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। জ্ঞানের পথ সবার জন্য উন্মুক্ত।
এরপর এসেছে মুক্তঃ শব্দটি। এর মূল ধাতু হলো মুচ, যার অর্থ ছেড়ে দেওয়া, মুক্ত করা বা বন্ধন থেকে বের করে আনা। মুক্ত শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো বন্ধনমুক্ত বা আবদ্ধতা থেকে মুক্ত। গীতার বিভিন্ন ভাষ্যে এই মুক্তির অর্থ বিভিন্ন মাত্রায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোথাও এটি পাপ বা অশুভতা থেকে মুক্তির অর্থে এসেছে, আবার বৃহত্তর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় এটি মুক্তির চূড়ান্ত ধারণার সঙ্গেও সম্পর্কিত। এখানে মুক্তিকে কেবল মৃত্যুর পর কোনো বিশেষ অবস্থায় পৌঁছানোর বিষয় হিসেবে না দেখে মানুষের অন্তরের অশুভ প্রবণতা, অজ্ঞতা, অহংকার এবং বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হওয়ার অর্থেও বোঝা যায়। মানুষ যখন সত্যকে গ্রহণ করে এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে শুরু করে, তখন তার ভিতরের বহু বন্ধন ধীরে ধীরে শিথিল হয়।
শুভান্ লোকান্ শব্দবন্ধটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শুভ অর্থ মঙ্গলময়, কল্যাণকর, পবিত্র বা সুন্দর। লোক শব্দের অর্থ জগৎ, অস্তিত্বের স্তর অথবা কোনো নির্দিষ্ট জীবনক্ষেত্র। ধর্মতাত্ত্বিক অর্থে শুভ লোক বলতে পুণ্যকর্মীদের প্রাপ্য কল্যাণময় লোক বা অস্তিত্বের স্তর বোঝানো যেতে পারে। আবার প্রতীকী ও দার্শনিক অর্থে শুভ লোককে এমন এক চেতনার স্তর হিসেবেও বোঝা যায় যেখানে মানুষের চিন্তা, কর্ম ও জীবন শুভতার দিকে অগ্রসর হয়। এই দৃষ্টিতে শুভ লোক কেবল কোনো দূরবর্তী জগত নয়। মানুষের বর্তমান জীবনও তার কর্ম ও চেতনার দ্বারা শুভ অথবা অশুভ অবস্থায় পরিণত হতে পারে।
প্রাপ্নুয়াত্ শব্দটির মূল অর্থ হলো লাভ করা, অর্জন করা বা পৌঁছানো। এর সঙ্গে পুণ্যকর্মণাম্ শব্দটি যুক্ত হয়েছে। পুণ্য অর্থ শুভ, কল্যাণকর ও ধর্মসম্মত এবং কর্ম অর্থ কাজ বা কার্য। পুণ্যকর্মণাম্ অর্থ পুণ্যকর্মসম্পন্ন ব্যক্তিদের। এই অংশটি শ্লোকের কারণ ও ফলের সম্পর্ককে স্পষ্ট করে। মানুষের শ্রবণ কেবল একটি বৌদ্ধিক অভিজ্ঞতা নয়। যথাযথভাবে শ্রবণ করলে তার চিন্তা পরিবর্তিত হতে পারে, চিন্তা পরিবর্তিত হলে আচরণ পরিবর্তিত হতে পারে এবং আচরণ পরিবর্তিত হলে তার জীবনের গতিও শুভতার দিকে অগ্রসর হতে পারে। এই কারণেই পুণ্যকর্মের সঙ্গে শুভ লোকপ্রাপ্তির সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে।
দার্শনিক দৃষ্টিতে এই শ্লোক মানুষের জ্ঞান লাভের একটি মৌলিক সূত্র প্রকাশ করে। জ্ঞান কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়। জ্ঞান গ্রহণের জন্য গ্রহণকারীর মানসিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন অহংকারী মানুষ সত্য কথা শুনেও তা গ্রহণ করতে পারে না। একজন বিদ্বেষী মানুষ মহৎ শিক্ষার মধ্যেও শুধু দোষ খুঁজে বেড়াতে পারে। কিন্তু একজন বিনয়ী ও শ্রদ্ধাবান মানুষ নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করে সত্যের সামনে দাঁড়াতে পারে। এই কারণে গীতার শিক্ষা শুধু কী বলা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে না, কে কীভাবে শুনছে তার ওপরও নির্ভর করে। সত্যের সামনে শ্রোতার মানসিকতা অনেক সময় সত্যের উপলব্ধির গভীরতা নির্ধারণ করে।
বেদান্তীয় দৃষ্টিতে শ্রবণ একটি বিশেষ সাধনা। শাস্ত্রের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা, তার অর্থ নিয়ে চিন্তা করা এবং সেই উপলব্ধিকে জীবনের গভীরে প্রতিষ্ঠিত করা জ্ঞানসাধনার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই শ্লোক সেই শ্রবণের উপযুক্ত মানসিক পরিবেশের কথা বলে। শ্রদ্ধা হলো গ্রহণের প্রস্তুতি এবং অনসূয়াহীনতা হলো অহংকার ও বিদ্বেষের প্রতিবন্ধকতা দূর করা। যখন এই দুই গুণের সঙ্গে শ্রবণ যুক্ত হয়, তখন শাস্ত্রের জ্ঞান কেবল বাইরের শব্দ হিসেবে থাকে না। তা ধীরে ধীরে মানুষের অন্তর্জগতে প্রবেশ করে।
ভক্তির দৃষ্টিতে এই শ্লোকের তাৎপর্য আরও গভীর। ভক্তির মূলেই রয়েছে শ্রদ্ধা এবং সমর্পণ। ভক্ত যখন ভগবানের কথা শ্রবণ করে, তখন সে কেবল তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে শোনে না। সে নিজের জীবনকে সেই শিক্ষার আলোয় দেখতে চায়। এই শ্রবণ তার হৃদয়ে ভক্তি জাগায়, অহংকার কমায় এবং জীবনের প্রতি একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি করে। তাই ভক্তির ধারায় শাস্ত্রশ্রবণ নিজেই একটি সাধনা। গীতার বক্তব্য শ্রবণ করতে করতে মানুষ নিজের কর্ম, ইচ্ছা, আসক্তি এবং কর্তব্য সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শেখে।
কর্মযোগের দৃষ্টিতে পুণ্যকর্ম শব্দটির গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গীতা মানুষের জীবনে কর্মকে অপরিহার্য বলে দেখেছে। তাই আধ্যাত্মিক জ্ঞান যদি মানুষের কর্মজীবনে কোনো পরিবর্তন না আনে, তবে সেই জ্ঞান এখনও সম্পূর্ণভাবে জীবন্ত হয়ে ওঠেনি। সত্যিকার জ্ঞান মানুষের কর্মকে আরও নৈতিক, নিঃস্বার্থ এবং কল্যাণমুখী করে। এই কারণে গীতার শিক্ষা শ্রবণ করার ফল হিসেবে পুণ্যকর্মীদের শুভ লোকপ্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে জ্ঞান এবং কর্মের একটি গভীর ঐক্য প্রকাশ পেয়েছে।
মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে অনসূয়া শব্দটি অত্যন্ত আধুনিক অর্থ বহন করে। মানুষের অহং অনেক সময় সত্য গ্রহণের পথে বাধা সৃষ্টি করে। কেউ যখন আমাদের ভুল ধরিয়ে দেয়, তখন আমরা অনেক সময় বক্তব্যের সত্যতা যাচাই না করে ব্যক্তিগতভাবে আহত হয়ে যাই। একজন শিক্ষক ছাত্রকে তার ভুল দেখালে ছাত্র যদি সত্যটি গ্রহণ করার বদলে মনে করে যে শিক্ষক তাকে অপমান করেছেন, তাহলে তার শেখার পথ বন্ধ হয়ে যায়। আবার কোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তি আমাদের এমন একটি সত্য বললেন যা আমরা শুনতে চাই না। যদি আমরা অহংকারের কারণে তা প্রত্যাখ্যান করি, তাহলে আমরা নিজের উন্নতির একটি সুযোগ হারাই। এই দৃষ্টিতে অনসূয়া হলো সেই মানসিক পরিপক্বতা যার মাধ্যমে মানুষ সত্যকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে না দেখে আত্মোন্নতির সম্ভাবনা হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে।
এই শ্লোককে একটি আয়নার উপমার মাধ্যমে আরও সহজভাবে বোঝা যায়। মানুষের মন যদি একটি আয়না হয়, তবে শ্রদ্ধা সেই আয়নাকে সত্যের সামনে স্থির রাখে এবং অনসূয়াহীনতা সেই আয়নার ধুলো পরিষ্কার করে। আয়না যদি ধুলোময় হয়, তাহলে সামনে দাঁড়ানো মানুষটির প্রতিবিম্ব স্পষ্ট দেখা যায় না। তেমনি বিদ্বেষ, অহংকার, ঈর্ষা এবং পূর্বধারণায় আচ্ছন্ন মন সত্যকে স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। কিন্তু মন যখন শ্রদ্ধা ও বিনয়ের দ্বারা পরিশুদ্ধ হয়, তখন জ্ঞানের আলো সেখানে পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।
ভগবদ্গীতা ১৮.৭২ — একাগ্রচিত্তে জ্ঞানশ্রবণ, মোহের বিনাশ ও আত্মজাগরণের চূড়ান্ত প্রশ্ন
এই শিক্ষা শুধু আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য নয়, সাধারণ মানবজীবনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। শিক্ষার ক্ষেত্রে একজন ভালো ছাত্র সেই ব্যক্তি নয় যে শুধু শিক্ষকের কথা মুখস্থ করে। বরং ভালো ছাত্র সে যে শ্রদ্ধার সঙ্গে শোনে, প্রশ্ন করে, চিন্তা করে এবং সত্যকে নিজের উপলব্ধিতে রূপান্তরিত করে। পরিবারে এই শিক্ষা আমাদের অন্যের কথা মন দিয়ে শুনতে শেখায়। কর্মক্ষেত্রে এটি সমালোচনা ও পরামর্শ গ্রহণের মানসিকতা তৈরি করে। ব্যক্তিগত জীবনে এটি নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস দেয়। আত্মোন্নতির পথে এটি আমাদের শেখায় যে নিজের অহংকারকে রক্ষা করার চেয়ে সত্যকে জানা অধিক মূল্যবান।
এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো শ্রদ্ধা কখনো অন্ধ বিশ্বাসের সমার্থক নয়। গীতা প্রশ্নকে নিষিদ্ধ করে না। বরং গীতার সমগ্র কথোপকথনই প্রশ্ন ও উত্তরের মাধ্যমে এগিয়েছে। অর্জুন প্রশ্ন করেছেন, সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং নিজের দুর্বলতা স্বীকার করেছেন। কৃষ্ণ তাকে যুক্তি, দর্শন, কর্ম, জ্ঞান এবং ভক্তির মাধ্যমে উত্তর দিয়েছেন। তাই অনসূয়াহীনতা মানে প্রশ্নহীনতা নয়। এর অর্থ হলো বিদ্বেষপূর্ণভাবে প্রশ্ন না করা। সত্য অনুসন্ধানের জন্য প্রশ্ন করা জ্ঞানের পথকে উন্মুক্ত করে, কিন্তু অহংকারের জন্য প্রশ্ন করা সত্যকে আড়াল করতে পারে।
এই কারণে শ্লোকটির গভীরতম শিক্ষা হলো মানুষের শ্রবণক্ষমতার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক রূপান্তর। আমরা প্রত্যেকেই প্রতিদিন অসংখ্য কথা শুনি। কিন্তু সব শোনা জ্ঞান হয়ে ওঠে না। কোনো কথা কানে পৌঁছাতে পারে কিন্তু হৃদয়ে পৌঁছাতে পারে না। কোনো শিক্ষা বুদ্ধিতে পৌঁছাতে পারে কিন্তু জীবনে পৌঁছাতে পারে না। গীতার এই শ্লোক সেই ব্যবধানটি পূরণ করার আহ্বান জানায়। শ্রদ্ধা দিয়ে শোনা এবং অনসূয়াহীনভাবে গ্রহণ করা হলে একটি সাধারণ শ্রবণও আত্মপরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
সমগ্র শ্লোকটিকে একত্রে দেখলে একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক পথের চিত্র ফুটে ওঠে। শ্রদ্ধা মানুষের হৃদয়কে উন্মুক্ত করে। অনসূয়াহীনতা সেই হৃদয়কে বিদ্বেষ ও অহংকার থেকে রক্ষা করে। শ্রবণ জ্ঞানকে অন্তরে প্রবেশের সুযোগ দেয়। সেই জ্ঞান মানুষের অশুভ প্রবণতা ও বন্ধনকে ধীরে ধীরে শিথিল করে। মানুষ শুভ কর্মের দিকে অগ্রসর হয় এবং তার জীবন কল্যাণময় হয়ে ওঠে। এই ধারায় মুক্তি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি একটি অন্তর্গত রূপান্তরের ফল।
অতএব শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের একাত্তরতম শ্লোক আমাদের শুধু গীতা শুনতে বলে না। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে শুনতে হয়। সত্যের সামনে অহংকার নিয়ে নয়, শ্রদ্ধা নিয়ে দাঁড়াতে হয়। বিদ্বেষ নিয়ে নয়, অনসূয়াহীন মন নিয়ে শুনতে হয়। কেবল শব্দ শোনা নয়, তার অর্থ উপলব্ধি করতে হয়। আর সেই উপলব্ধিকে জীবনের কর্ম ও চরিত্রে প্রকাশ করতে হয়। এই দৃষ্টিতে শ্রদ্ধাবান হওয়া মানে সত্যের প্রতি হৃদয় উন্মুক্ত করা, অনসূয়াহীন হওয়া মানে সত্যের প্রতি বিদ্বেষ না রাখা এবং শ্রবণ করা মানে নিজের অন্তর্জগতকে পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করা।
শেষ বিচারে এই শ্লোকের ভাষাগত, দার্শনিক এবং প্রতীকী সব অর্থ একত্র করলে একটি গভীর সত্য প্রকাশিত হয়। মানুষের মুক্তির পথ অনেক সময় বাইরে কোথাও শুরু হয় না। তা শুরু হয় তার নিজের মন থেকে। মন যখন অহংকারের পরিবর্তে বিনয়কে গ্রহণ করে, বিদ্বেষের পরিবর্তে শুভবোধকে গ্রহণ করে এবং অজ্ঞতার পরিবর্তে সত্যকে জানার আকাঙ্ক্ষা গ্রহণ করে, তখন তার জীবন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে। তাই এই শ্লোকের সারকথা হলো শ্রদ্ধা জ্ঞানের দরজা খুলে দেয়, অনসূয়াহীনতা সেই দরজার প্রতিবন্ধকতা দূর করে, শ্রবণ জ্ঞানকে অন্তরে প্রবেশ করায় এবং সেই জ্ঞান মানুষকে অশুভ বন্ধন থেকে মুক্ত করে শুভতার দিকে নিয়ে যায়। এই কারণেই গীতার এই শিক্ষা আজও মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, শিক্ষা, নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
ভগবদ্গীতা ১৮.৭২ — একাগ্রচিত্তে জ্ঞানশ্রবণ, মোহের বিনাশ ও আত্মজাগরণের চূড়ান্ত প্রশ্ন
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!