সম্পর্কিত

শেয়ার করুন

ভগবদ্গীতা ১৮.৭২ — একাগ্রচিত্তে জ্ঞানশ্রবণ, মোহের বিনাশ ও আত্মজাগরণের চূড়ান্ত প্রশ্ন

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
তারিখে পোস্ট করা হয়েছে
কচ্চিদেতৎ শ্রতং পার্থ ত্বয়ৈকাগ্রেণ চেতসা। কচ্চিদজ্ঞানসম্মোহঃ প্রণষ্টস্তে ধনঞ্জয়।।৭২।।
কচ্চিদেতৎ শ্রতং পার্থ ত্বয়ৈকাগ্রেণ চেতসা। 
কচ্চিদজ্ঞানসম্মোহঃ প্রণষ্টস্তে ধনঞ্জয়।।৭২।।

অনুবাদঃ হে পার্থ! হে ধনঞ্জয়! তুমি একাগ্রচিত্তে এই গীতা শ্রবণ করেছ কি? তোমার অজ্ঞান-জনিত মোহ বিদুরিত হয়েছে কি?

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের বাহাত্তরতম শ্লোকটি গীতার সমগ্র শিক্ষার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমাপ্তি মুহূর্তকে ধারণ করে। দীর্ঘ সময় ধরে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে আত্মা, কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি, যোগ, ত্যাগ, সন্ন্যাস, স্বধর্ম এবং ঈশ্বরের প্রকৃতি সম্পর্কে যে গভীর শিক্ষা দিয়েছেন, তার শেষে তিনি অর্জুনের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখছেন। শ্লোকটি হলো কচ্চিদেতৎ শ্রুতং পার্থ ত্বয়ৈকাগ্রেণ চেতসা। কচ্চিদজ্ঞানসম্মোহঃ প্রণষ্টস্তে ধনঞ্জয়। এর সহজ অর্থ হলো হে পার্থ, তুমি কি একাগ্রচিত্তে আমার এই উপদেশ শুনেছ। হে ধনঞ্জয়, তোমার অজ্ঞানজাত গভীর মোহ কি সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয়েছে। এই প্রশ্নের মধ্যে শুধু একজন শিক্ষকের পক্ষ থেকে ছাত্রের কাছে পাঠ বোঝার পরীক্ষা নেই। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের আত্মজাগরণ, সত্য উপলব্ধি এবং অন্তরের অন্ধকার দূর হওয়ার একটি গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান।

এই শ্লোকের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শব্দ কচ্চিত্। সংস্কৃত কচ্চিত্ শব্দটি সাধারণত প্রশ্ন বা অনুসন্ধানের ভাব প্রকাশ করে। এর অর্থ কি, নিশ্চয়ই কি, সত্যিই কি অথবা আশা করি কি হতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ এখানে সরাসরি কোনো আদেশ দিচ্ছেন না। তিনি অর্জুনকে নিজের অন্তরের অবস্থা নিজেকেই পরীক্ষা করতে বলছেন। এই প্রশ্নের মধ্যে এক ধরনের স্নেহ এবং আত্মপর্যবেক্ষণের আহ্বান রয়েছে। কৃষ্ণ যেন জানতে চাইছেন, এতক্ষণ যা বলা হয়েছে তা কি কেবল কানে পৌঁছেছে, নাকি তা অর্জুনের অন্তরে প্রবেশ করেছে। এই কারণেই কচ্চিত্ শব্দটি গীতার শেষ শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দরজা খুলে দেয়। সত্য শোনা এবং সত্য উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়। মানুষের জীবনে অনেক কথা শোনা হয়, অনেক জ্ঞান অর্জিত হয়, কিন্তু সেই জ্ঞান যখন চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণের পরিবর্তন ঘটায় তখনই তা জীবন্ত জ্ঞানে পরিণত হয়।

এরপর এসেছে এতৎ শব্দটি। এতৎ অর্থ এই বা এই বিষয়। এখানে এতৎ দ্বারা শ্রীকৃষ্ণের সমগ্র উপদেশকে বোঝানো হয়েছে। গীতার পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলোতে কৃষ্ণ যে বিশাল আধ্যাত্মিক দর্শন তুলে ধরেছেন, এই ছোট্ট শব্দটি যেন তারই দিকে ইঙ্গিত করছে। আত্মা অবিনশ্বর, দেহ পরিবর্তনশীল, কর্মের প্রকৃতি কী, কর্তব্য কী, জ্ঞান কী, ভক্তির শক্তি কী, ত্যাগের প্রকৃত অর্থ কী, মানুষের আচরণ কীভাবে প্রকৃতির গুণ দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে মানুষ ঈশ্বরের আশ্রয় গ্রহণ করে মুক্তির দিকে অগ্রসর হতে পারে, এই সমস্ত শিক্ষাই এতৎ শব্দের অন্তর্গত। ফলে এতৎ কোনো সাধারণ বিষয়ের নির্দেশ নয়। এটি গীতার সমগ্র জ্ঞানধারার প্রতি একটি সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত।

শ্রুতম্ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শ্রু ধাতু থেকে। শ্রু অর্থ শোনা বা শ্রবণ করা। এই ধাতু থেকেই শ্রুতি, শ্রুত এবং শ্রবণ প্রভৃতি শব্দের উৎপত্তি। শ্লোকে শ্রুতম্ অর্থ শোনা হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় দর্শনে শ্রবণ কেবল কানে শব্দ প্রবেশ করার নাম নয়। বিশেষ করে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে শ্রবণ হলো সত্যকে মনোযোগ দিয়ে গ্রহণ করা। বেদান্তীয় চিন্তায় শ্রবণ, মনন এবং নিদিধ্যাসনকে জ্ঞানলাভের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রথমে সত্য শুনতে হয়, তারপর যুক্তি ও বিচার দিয়ে তা নিয়ে চিন্তা করতে হয় এবং শেষে সেই সত্যকে গভীরভাবে অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। তাই কৃষ্ণ যখন জিজ্ঞাসা করেন তুমি কি শুনেছ, তখন তাঁর প্রশ্নের গভীরে রয়েছে তুমি কি সত্যিই গ্রহণ করেছ এই অনুসন্ধান।

পার্থ শব্দটি অর্জুনের একটি বিশেষ সম্বোধন। পৃথা ছিলেন কুন্তীর আরেক নাম এবং পৃথার পুত্র হওয়ার কারণে অর্জুনের নাম পার্থ। কৃষ্ণ যখন অর্জুনকে পার্থ বলে ডাকছেন, তখন এই সম্বোধনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা এবং স্নেহের অনুভূতি রয়েছে। তিনি কেবল একজন যোদ্ধাকে সম্বোধন করছেন না, তিনি তাঁর প্রিয় শিষ্য এবং বন্ধুকে সম্বোধন করছেন। এই কারণে শ্লোকের শুরুতেই একটি কোমল মানবিক আবহ তৈরি হয়। কঠিন দর্শনের মাঝেও শিক্ষক এবং শিষ্যের সম্পর্ক এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ত্বয়া শব্দটি ত্বম্ অর্থাৎ তুমি শব্দের একটি ব্যাকরণিক রূপ। এর অর্থ তোমার দ্বারা বা তোমার মাধ্যমে। শ্রুতম্ এবং ত্বয়া একসঙ্গে বোঝায় যে এই শিক্ষা অর্জুনের দ্বারা শ্রবণ করা হয়েছে। এখানে শিক্ষার গ্রহণকারীর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সত্য উপস্থিত থাকলেই যথেষ্ট নয়। সত্য গ্রহণের জন্য শ্রোতার মন প্রস্তুত হতে হয়। এই প্রস্তুতির কথাই পরবর্তী শব্দ একাগ্রেণ চেতসা প্রকাশ করছে।

ভগবদ্গীতা ১৮.৭৩ — মোহের বিনাশ, স্মৃতির পুনরুদ্ধার, সংশয়মুক্তি ও ঈশ্বরের আদেশে প্রতিষ্ঠা


একাগ্র শব্দটি এক এবং অগ্র এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। এক অর্থ একটি এবং অগ্র অর্থ সামনের দিক, শীর্ষ বা লক্ষ্যবিন্দু। ফলে একাগ্র অর্থ এমন কিছু যার লক্ষ্য একদিকে স্থির। মানসিক অর্থে একাগ্রতা হলো চিত্তের বিচ্ছিন্ন শক্তিকে একটি কেন্দ্রে স্থাপন করা। মানুষের মন সাধারণত বহু দিকে ছুটে বেড়ায়। কখনো অতীতের স্মৃতিতে, কখনো ভবিষ্যতের আশঙ্কায়, কখনো আকাঙ্ক্ষায়, কখনো ভয়ে এবং কখনো ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণে মন বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। এই বিচ্ছিন্নতার বিপরীত হলো একাগ্রতা। কৃষ্ণ তাই শুধু জানতে চাইছেন না যে অর্জুন শুনেছে কি না। তিনি জানতে চাইছেন অর্জুন কি একাগ্রচিত্তে শুনেছে।

চেতসা শব্দটি চেতস্ থেকে এসেছে এবং এর অর্থ মন, চিত্ত বা অন্তর্মন। একাগ্রেণ চেতসা অর্থ একাগ্রচিত্তে বা কেন্দ্রীভূত মন দিয়ে। এই দুটি শব্দ একত্রে গীতার একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য প্রকাশ করে। জ্ঞান গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধু শ্রবণশক্তি যথেষ্ট নয়। চিত্তকে প্রস্তুত করতে হয়। মন যদি অস্থির থাকে, তাহলে গভীর সত্যও মানুষের মধ্যে স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। একাগ্রতা তাই কেবল পড়াশোনার একটি পদ্ধতি নয়। এটি আত্মজ্ঞান লাভের একটি মৌলিক শর্ত।

এরপর আসে অজ্ঞান শব্দটি। অজ্ঞান শব্দটি অ এবং জ্ঞান এই দুই অংশে গঠিত। অ অর্থ না বা অনুপস্থিতি এবং জ্ঞান অর্থ জানা বা উপলব্ধি। সাধারণ অর্থে অজ্ঞান মানে জ্ঞানের অভাব। কিন্তু গীতার দর্শনে অজ্ঞান শব্দটির অর্থ অনেক গভীর। এখানে অজ্ঞান বলতে শুধু কোনো তথ্য না জানা বোঝায় না। এর অর্থ নিজের প্রকৃত স্বরূপ এবং বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কে মৌলিক অজ্ঞতা। একজন মানুষ পৃথিবীর অসংখ্য বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানী হতে পারেন, কিন্তু যদি তিনি নিজের প্রকৃত সত্তাকে কেবল দেহ ও ইন্দ্রিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করেন, তাহলে গীতার দৃষ্টিতে তাঁর মধ্যে অজ্ঞান এখনও বিদ্যমান।

অজ্ঞান থেকে জন্ম নেয় মোহ। মোহ অর্থ এমন এক বিভ্রান্তি যার কারণে মানুষ বাস্তবতাকে সঠিকভাবে দেখতে পারে না। সম্মোহ শব্দটি সম্ এবং মোহের সমন্বয়ে গঠিত। সম্ গভীরতা বা সম্পূর্ণতার ভাব প্রকাশ করে এবং মোহ বিভ্রান্তি বা আসক্তিজাত অন্ধতাকে নির্দেশ করে। ফলে সম্মোহ হলো গভীর বিভ্রান্তি বা সম্পূর্ণ মোহগ্রস্ততা। অজ্ঞানসম্মোহ শব্দটি অজ্ঞানজাত গভীর মোহকে বোঝায়। অর্থাৎ মানুষ যখন বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে, তখন সেই অজ্ঞতা তার চিন্তা ও অনুভূতিকে বিকৃত করে এবং সে ভুলভাবে বিষয়কে দেখতে শুরু করে। এই ভুল দৃষ্টিই তাকে মোহের দিকে নিয়ে যায়।

অর্জুনের জীবনের কুরুক্ষেত্রের সংকট এই অজ্ঞানসম্মোহের একটি শক্তিশালী উদাহরণ। যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে সে নিজের আত্মীয়স্বজন, গুরুজন এবং বন্ধুদের দেখে গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছিল। তার মধ্যে করুণা ছিল, কিন্তু সেই করুণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল কর্তব্য সম্পর্কে বিভ্রান্তি, সম্পর্কের প্রতি আসক্তি, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় এবং নিজের ভূমিকা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা। সে বুঝতে পারছিল না কোনটি প্রকৃত কর্তব্য এবং কোনটি আবেগের প্রভাব। কৃষ্ণের দীর্ঘ উপদেশ মূলত এই বিভ্রান্ত দৃষ্টিকে পরিষ্কার করার একটি প্রক্রিয়া।

প্রণষ্ট শব্দটি এসেছে নশ্ ধাতু থেকে, যার অর্থ বিনষ্ট হওয়া বা ধ্বংস হওয়া। প্র উপসর্গের মাধ্যমে সম্পূর্ণতার ভাব আরও শক্তিশালী হয়েছে। প্রণষ্ট অর্থ সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট বা বিলুপ্ত। এই শব্দটি শ্লোকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষ্ণ জানতে চাইছেন না যে অর্জুনের মোহ কিছুটা কমেছে কি না। তিনি জানতে চাইছেন তার অজ্ঞানজাত গভীর মোহ কি সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে গীতার শিক্ষার লক্ষ্য কেবল সাময়িক মানসিক সান্ত্বনা নয়। লক্ষ্য হলো দৃষ্টির মৌলিক পরিবর্তন।

ধনঞ্জয় শব্দটি অর্জুনের আরেকটি পরিচিত নাম। ধন এবং জয় এই দুটি ভাবের সমন্বয়ে এর অর্থ ধন জয়কারী বা সম্পদ বিজয়ী। অর্জুন বাহ্যিক জগতে অসাধারণ যোদ্ধা এবং বিজয়ী ছিলেন। কিন্তু শ্লোকের শেষ প্রান্তে ধনঞ্জয় সম্বোধনের একটি গভীর প্রতীকী অর্থও অনুভব করা যায়। যে ব্যক্তি বাইরের জগৎ জয় করতে পারে, তাকে নিজের অন্তরের অজ্ঞানও জয় করতে হবে। বাহ্যিক বিজয় যত বড়ই হোক, অন্তরের মোহ যদি অটুট থাকে তাহলে মানুষের প্রকৃত বিজয় সম্পূর্ণ হয় না। এই দৃষ্টিতে ধনঞ্জয় নামটি বাহ্যিক বিজয় থেকে অভ্যন্তরীণ বিজয়ের দিকে একটি আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত বহন করে।

এই শ্লোকের দার্শনিক তাৎপর্য ভারতীয় জ্ঞানতত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এখানে জ্ঞানকে কেবল তথ্য হিসেবে দেখা হয়নি। সত্যিকার জ্ঞান এমন একটি শক্তি যা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে। মানুষ কত কিছু জানে সেটিই প্রধান বিষয় নয়। সে যা জানে তা তার জীবনে কী পরিবর্তন ঘটিয়েছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। যদি একজন মানুষ আত্মা, কর্ম, ধর্ম এবং ঈশ্বর সম্পর্কে অনেক কথা জানেন, কিন্তু তার ভয়, লোভ, অহংকার, আসক্তি এবং বিভ্রান্তি আগের মতোই থাকে, তাহলে তার জ্ঞান এখনও জীবনের গভীরে প্রবেশ করেনি। কৃষ্ণের প্রশ্ন তাই জ্ঞানের ফল সম্পর্কে প্রশ্ন।

অদ্বৈত বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোকের অজ্ঞান ও মোহ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। মানুষের মৌলিক সমস্যা হলো নিজের প্রকৃত আত্মস্বরূপ সম্পর্কে অজ্ঞতা। সে নিজেকে দেহ, মন এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে একাত্ম করে দেখে। এই ভুল পরিচয় থেকে জন্ম নেয় অহংকার, আসক্তি, ভয় এবং দুঃখ। আত্মজ্ঞান সেই ভুল পরিচয়কে দূর করে। এই অর্থে অজ্ঞানসম্মোহ প্রণষ্ট হওয়া মানে নিজের প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে সত্য উপলব্ধির মাধ্যমে ভুল পরিচয়ের অবসান।

যোগদর্শনের দৃষ্টিতে একাগ্র চিত্ত বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। চিত্ত যখন বিক্ষিপ্ত থাকে তখন মানুষের উপলব্ধি অস্পষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু মন যখন একাগ্র হয় তখন সত্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তাই একাগ্রেণ চেতসা শব্দটি শুধু মনোযোগ দিয়ে শোনার নির্দেশ নয়। এটি চিত্তসংযম এবং অন্তর্মুখী সচেতনতার একটি আধ্যাত্মিক ভিত্তি। ভক্তির দৃষ্টিতেও এর গভীরতা রয়েছে। ঈশ্বরের প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং আত্মসমর্পণের মাধ্যমে মন যখন একদিকে স্থির হয়, তখন জ্ঞান হৃদয়ের মধ্যে প্রবেশ করার সুযোগ পায়।

মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখলেও শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অর্জুনের সংকটকে একজন মানুষের গভীর মানসিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা যায়। একদিকে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অন্যদিকে তার কর্তব্য। একদিকে আবেগ, অন্যদিকে নৈতিক দায়িত্ব। একদিকে ভয়, অন্যদিকে কর্মের আহ্বান। কৃষ্ণের শিক্ষা তার চিন্তার কাঠামোকে নতুনভাবে সংগঠিত করে। ফলে বিভ্রান্ত মন ধীরে ধীরে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করে। এই পরিবর্তন আধুনিক ভাষায় মানুষের চিন্তার পুনর্গঠন এবং আত্মপরিচয়ের গভীর পুনর্বিবেচনার সঙ্গে তুলনা করা যায়।

শ্লোকটির প্রতীকী অর্থ আরও বিস্তৃত। অর্জুনকে দেখা যেতে পারে বিভ্রান্ত মানবচেতনার প্রতীক হিসেবে। কৃষ্ণ হতে পারেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং ঈশ্বরীয় সত্যের প্রতীক। কুরুক্ষেত্র হতে পারে মানুষের জীবনসংগ্রাম। যুদ্ধ হতে পারে কর্তব্য এবং আবেগের সংঘর্ষ। আর অজ্ঞানসম্মোহ হতে পারে মানুষের নিজের প্রকৃত পরিচয় ভুলে গিয়ে বাহ্যিক পরিস্থিতির সঙ্গে অতিরিক্তভাবে একাত্ম হয়ে পড়া। এই প্রতীকী পাঠে গীতা শুধু প্রাচীন যুদ্ধক্ষেত্রের শিক্ষা নয়। এটি প্রত্যেক মানুষের অন্তর্গত কুরুক্ষেত্রের জন্য একটি নির্দেশনা।

এই শ্লোকের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো শ্রবণ এবং রূপান্তরের মধ্যে সম্পর্ক। একজন মানুষ অনেক শাস্ত্র পড়তে পারেন, অনেক বক্তৃতা শুনতে পারেন এবং অসংখ্য ধর্মীয় ধারণা মুখস্থ করতে পারেন। কিন্তু সত্যিকারের জ্ঞান তখনই জীবন্ত হয় যখন তার আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। কৃষ্ণ প্রথমে জানতে চাইছেন তুমি কি শুনেছ এবং তারপর জানতে চাইছেন তোমার মোহ কি বিনষ্ট হয়েছে। এই দুটি প্রশ্নের মধ্যেই জ্ঞানের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয়ে যায়। সত্য শোনা জ্ঞানের শুরু, কিন্তু মোহের বিনাশ জ্ঞানের ফল।

একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যায়। অন্ধকার ঘরে কেউ একটি দড়িকে সাপ মনে করে ভয় পেতে পারে। অন্ধকার হলো অজ্ঞান। দড়িকে সাপ মনে করা হলো মোহ। সেই ভুল ধারণা থেকে যে ভয় সৃষ্টি হয় তা সম্মোহের ফল। যখন আলো জ্বলে এবং মানুষ বুঝতে পারে যে এটি সাপ নয়, দড়ি, তখন তার ভয় দূর হয়ে যায়। এখানে আলো নতুন কোনো বাস্তবতা সৃষ্টি করেনি। বরং আলো পূর্বে উপস্থিত বাস্তবতাকে সঠিকভাবে দেখতে সাহায্য করেছে। গীতার জ্ঞানও তেমন। জ্ঞান নতুন কোনো আত্মাকে সৃষ্টি করে না। এটি কেবল অজ্ঞান ও মোহের আবরণ সরিয়ে সত্যকে দেখতে সাহায্য করে।

এই কারণে অষ্টাদশ অধ্যায়ের এই শ্লোকটি গীতার সমগ্র শিক্ষার একটি চূড়ান্ত আত্মপরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। গীতার শুরুতে অর্জুন বিষাদ, ভয় এবং বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি নিজের কর্তব্য সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে অস্ত্র ত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। কৃষ্ণ তখন তাকে ধীরে ধীরে কর্ম, জ্ঞান, আত্মা, যোগ, ভক্তি, ত্যাগ এবং ঈশ্বরের সত্য সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছেন। দীর্ঘ শিক্ষার শেষে প্রশ্ন উঠেছে তার ভিতরের পরিবর্তন নিয়ে। অজ্ঞান কি দূর হয়েছে। মোহ কি বিনষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ গীতার শেষ পর্যায়ে বাহ্যিক যুদ্ধের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অন্তরের যুদ্ধের ফলাফল।

মানবজীবনের ক্ষেত্রেও এই শ্লোকের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রতিদিন মানুষকে নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হয় আমি কি সত্যিই শুনছি, নাকি শুধু শব্দ শুনছি। আমি কি একাগ্রচিত্ত, নাকি আমার মন অসংখ্য আকাঙ্ক্ষা ও ভয়ের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। আমি কী জানি না, সেটি কি আমি বুঝতে পারছি। আমার কোন মোহ আমাকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি যা শিখেছি তা কি আমার জীবনকে পরিবর্তন করেছে। এই প্রশ্নগুলো মানুষের আত্মজিজ্ঞাসাকে গভীর করে এবং তাকে নিজের অন্তর্গত অবস্থার দিকে তাকাতে শেখায়।

শব্দগুলোর দিকে একসঙ্গে তাকালে শ্লোকটি একটি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক যাত্রার রূপ নেয়। শ্রবণ থেকে একাগ্রতা, একাগ্রতা থেকে উপলব্ধি, উপলব্ধি থেকে অজ্ঞানের অবসান এবং অজ্ঞানের অবসান থেকে মোহমুক্ত দৃষ্টির জন্ম হয়। এই ধারার মধ্যেই গীতার শিক্ষার প্রাণ নিহিত। মানুষের বাহ্যিক জীবন যতই জটিল হোক, তার মূল সংকট অনেক সময় নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং বাস্তবতাকে ভুলভাবে দেখার মধ্যে নিহিত থাকে। জ্ঞান সেই ভুল দৃষ্টিকে সংশোধন করে।

সবশেষে বলা যায়, কচ্চিদেতৎ শ্রুতং পার্থ ত্বয়ৈকাগ্রেণ চেতসা এবং কচ্চিদজ্ঞানসম্মোহঃ প্রণষ্টস্তে ধনঞ্জয় এই দুটি প্রশ্নের মধ্যে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একটি গভীর সারমর্ম নিহিত রয়েছে। সত্যকে শোনা প্রয়োজন, কিন্তু শুধু শোনা যথেষ্ট নয়। একাগ্রচিত্তে সত্যকে গ্রহণ করতে হয়, তা নিয়ে চিন্তা করতে হয় এবং জীবনের গভীরে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। তখন অজ্ঞান থেকে জন্ম নেওয়া মোহ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়। প্রকৃত জ্ঞান মানুষের কাছে নতুন কোনো বাহ্যিক পরিচয় তৈরি করে না। বরং তার অন্তরের ভুল পরিচয়, বিভ্রান্তি এবং অন্ধতা দূর করে তার প্রকৃত অবস্থাকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। তাই কৃষ্ণের প্রশ্ন আসলে শুধু অর্জুনের উদ্দেশে নয়। এটি প্রত্যেক মানুষের উদ্দেশে এক চিরন্তন আত্মজিজ্ঞাসা। তুমি কি সত্যিই শুনেছ। তোমার মন কি একাগ্র হয়েছে। তোমার অজ্ঞানজাত মোহ কি দূর হয়েছে। এবং তুমি কি এখন জীবনকে আগের মতো নয়, জ্ঞানের আলোয় নতুনভাবে দেখতে পারছ।

ভগবদ্গীতা ১৮.৭৩ — মোহের বিনাশ, স্মৃতির পুনরুদ্ধার, সংশয়মুক্তি ও ঈশ্বরের আদেশে প্রতিষ্ঠা

বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।

30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি

আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!

Heron Kumar Sikder
Written by Heron Kumar Sikder
এ প্রকাশিত: August 25, 2026 October 13, 2026

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি

শিরোনাম সম্পর্কে আরও অন্তর্দৃষ্টি