ভগবদ্গীতা ১৮.৭৬ — কৃষ্ণ-অর্জুনের পবিত্র সংলাপের স্মরণ, বিস্ময় ও অন্তরের আনন্দ
রাজন্ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য সংবাদমিমমদ্ভুতম্।
কেশবার্জুনয়োঃ পুণ্যং হৃষ্যামি চ মুহুর্মুহুঃ।।৭৬।।
অনুবাদঃ হে রাজন্! শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের এই পুণ্যজনক অদ্ভুত সংবাদ স্মরণ করতে করতে আমি বারংবার রোমাঞ্চিত হচ্ছি।
ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের ছিয়াত্তরতম শ্লোকে সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে যে অনুভূতির কথা প্রকাশ করেছেন, তা সমগ্র গীতার অন্যতম হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত। যুদ্ধক্ষেত্রে কেশব শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের মধ্যে সংঘটিত সেই আশ্চর্য ও পবিত্র সংলাপ সঞ্জয় বারবার স্মরণ করছেন এবং সেই স্মরণের মধ্য দিয়েই বারবার আনন্দিত হচ্ছেন। শ্লোকটির মূল বক্তব্য শুধু একটি অতীত ঘটনার স্মৃতিচারণ নয়। এর মধ্যে স্মৃতি, জ্ঞান, ভক্তি, বিস্ময়, পবিত্রতা এবং অন্তরের আনন্দ এক গভীর আধ্যাত্মিক ঐক্যে মিলিত হয়েছে। সঞ্জয়ের কাছে কৃষ্ণ ও অর্জুনের সংলাপ এমন কোনো সাধারণ কথোপকথন নয় যা একবার শুনে অতীতের পাতায় রেখে দেওয়া যায়। এই সংলাপ তাঁর চেতনার মধ্যে এমনভাবে স্থায়ী হয়ে গেছে যে তিনি যতবার সেটিকে স্মরণ করেন, ততবার তাঁর হৃদয়ে নতুন আনন্দের সঞ্চার হয়।
শ্লোকটির শুরুতেই রয়েছে রাজন্ শব্দটি। রাজন্ শব্দটি সংস্কৃতের প্রাচীন রাজা অর্থবোধক শব্দ এবং এখানে এটি সম্বোধন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে হে রাজন্ বলে সম্বোধন করছেন। এই সম্বোধনের মধ্যেও একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। ধৃতরাষ্ট্র রাজা, তাঁর হাতে ছিল রাজশক্তি, কিন্তু তিনি কুরুক্ষেত্রের ঘটনাবলি নিজের চোখে দেখতে পারেননি। অন্যদিকে সঞ্জয়ের কাছে ছিল সেই মহৎ সংলাপ উপলব্ধি করার বিশেষ সুযোগ। ফলে রাজশক্তি ও সত্যদর্শনের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য এখানে প্রকাশিত হয়েছে। মানুষের কাছে বাহ্যিক ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু সেই ক্ষমতা তাকে সত্য উপলব্ধির অধিকারী করে না। সত্য উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন নির্মল দৃষ্টি, শ্রবণশক্তি এবং অন্তরের গ্রহণক্ষমতা।
এই শ্লোকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর একটি হলো সংস্মৃত্য। সংস্কৃত সংস্মৃত্য শব্দটি সম্ উপসর্গ এবং স্মৃ ধাতুর সঙ্গে সম্পর্কিত। স্মৃ ধাতুর অর্থ স্মরণ করা, মনে রাখা এবং চেতনায় কোনো বিষয়কে পুনরায় উপস্থিত করা। সম্ উপসর্গ যুক্ত হওয়ায় স্মরণের মধ্যে পূর্ণতা ও গভীরতার ভাব যুক্ত হয়। সংস্মৃত্য অর্থ দাঁড়ায় সম্যকভাবে স্মরণ করে, গভীরভাবে স্মরণ করে অথবা অন্তরে পুনরায় ধারণ করে। কিন্তু সঞ্জয় শুধু একবার সংস্মৃত্য বলেননি। তিনি বলেছেন সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য। একই শব্দের এই পুনরুক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে গীতার এই সংলাপ তাঁর মনে একবার উদিত হয়ে মিলিয়ে যায় না। তিনি বারবার তার কাছে ফিরে যান। যতবার স্মরণ করেন, ততবার সেই জ্ঞান যেন তাঁর অন্তরে আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।
এই পুনরুক্তির মধ্যে মানুষের স্মৃতির একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্যও প্রকাশ পেয়েছে। জীবনের সব ঘটনা আমরা সমানভাবে স্মরণ করি না। কিছু ঘটনা কেবল অতীতের তথ্য হয়ে থাকে, আর কিছু ঘটনা আমাদের অন্তরের অংশ হয়ে যায়। যে অভিজ্ঞতা আমাদের চিন্তা, বিশ্বাস এবং চেতনাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে, আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তার কাছে বারবার ফিরে যাই। সঞ্জয়ের ক্ষেত্রে কৃষ্ণ ও অর্জুনের সংলাপ ঠিক তেমনই একটি অভিজ্ঞতা। তিনি কেবল একটি ধর্মীয় বক্তৃতা শুনেছিলেন এমন নয়। তিনি এমন একটি জ্ঞানসংলাপের সাক্ষী হয়েছিলেন যেখানে একজন মানুষের অস্তিত্বগত সংকটের সামনে ঈশ্বরীয় জ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিল। তাই সেই সংলাপ তাঁর স্মৃতিতে শুধু তথ্য হিসেবে নয়, জীবন্ত অভিজ্ঞতা হিসেবে রয়ে গেছে।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো সংবাদ বা সংস্কৃত সংবাদের মূল রূপ সংবাদ। সম্ এবং বদ্ ধাতুর সমন্বয়ে এই শব্দের গঠন। বদ্ ধাতুর অর্থ বলা বা কথা বলা এবং সম্ উপসর্গ একত্রতা বা পারস্পরিকতার ভাব প্রকাশ করে। সেই অর্থে সংবাদ হলো একত্রে বলা বা পরস্পরের মধ্যে অর্থপূর্ণ কথোপকথন। আধুনিক বাংলায় সংবাদ শব্দটি সাধারণত খবর বা সংবাদপত্রের খবর অর্থে ব্যবহৃত হলেও সংস্কৃত সংবাদের মূল অর্থ হলো সংলাপ বা পারস্পরিক কথোপকথন। গীতার ক্ষেত্রে এই অর্থটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গীতা কেবল একতরফা উপদেশ নয়। এটি কৃষ্ণ ও অর্জুনের গভীর সংলাপ। অর্জুন প্রশ্ন করেছেন, সংশয় প্রকাশ করেছেন, নিজের দুর্বলতা স্বীকার করেছেন এবং বারবার সত্য জানতে চেয়েছেন। কৃষ্ণ তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনের প্রকৃতি, আত্মা, কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি ও মুক্তির কথা ব্যাখ্যা করেছেন। তাই গীতার জ্ঞান সংলাপের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে।
সংলাপের এই ধারণাটি দর্শনের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্যকে কেবল মুখস্থ করা যায় না। সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য প্রশ্ন করতে হয়, সংশয় প্রকাশ করতে হয় এবং উত্তর নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে হয়। অর্জুনের সংশয় তাই দুর্বলতার চিহ্ন নয়। বরং সেই সংশয়ই তাকে গভীর জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়। কৃষ্ণও অর্জুনের উপর কোনো অন্ধ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না। তিনি জ্ঞান ব্যাখ্যা করেন, বিভিন্ন পথ দেখান এবং শেষ পর্যন্ত অর্জুনকে নিজের বিবেচনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। এই কারণে গীতার সংলাপ মানবজীবনে মুক্ত চিন্তা, প্রশ্ন এবং আত্মঅনুসন্ধানের এক অনন্য প্রতীক।
শ্লোকে এই সংলাপকে বলা হয়েছে অদ্ভুত। অদ্ভুত শব্দের অর্থ আশ্চর্য, বিস্ময়কর, অভাবনীয় এবং অসাধারণ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণত অস্ত্র, সংঘর্ষ, বিজয় এবং পরাজয়ের কথাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সেই যুদ্ধক্ষেত্রেই হঠাৎ শুরু হয় আত্মা, কর্তব্য, কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি, প্রকৃতি, ঈশ্বর এবং মুক্তি নিয়ে এক গভীর দার্শনিক আলোচনা। যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্য থেকে আত্মজিজ্ঞাসার জন্ম এবং মৃত্যুর সম্ভাবনার মধ্য থেকে অমৃত আত্মার জ্ঞান প্রকাশ পাওয়াই এই সংলাপকে অদ্ভুত করে তুলেছে। এখানে অদ্ভুত শব্দটি কেবল আশ্চর্য অর্থে নয়, মানুষের সাধারণ অভিজ্ঞতার সীমা অতিক্রম করে এমন এক গভীর সত্যের প্রতি বিস্ময়ও প্রকাশ করে।
এরপর এসেছে পুণ্য শব্দটি। পুণ্য বলতে সাধারণভাবে পবিত্র, শুভ, কল্যাণকর এবং ধর্মসম্মত অর্থ বোঝায়। কিন্তু গীতার এই প্রসঙ্গে পুণ্যকে শুধু কোনো ধর্মীয় কর্মের ফল হিসেবে দেখলে এর গভীরতা ধরা পড়ে না। পুণ্য এমন একটি শক্তি যা মানুষের চেতনাকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাকে উচ্চতর কল্যাণের দিকে পরিচালিত করে। কৃষ্ণ ও অর্জুনের সংলাপ পুণ্য কারণ এই সংলাপ মানুষের অজ্ঞতা দূর করে জ্ঞানের দিকে নিয়ে যায়। এটি মানুষকে নিজের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে, আত্মার প্রকৃতি সম্পর্কে ভাবতে শেখায় এবং জীবনের দুঃখ ও সংশয়ের মধ্যেও সত্যের সন্ধান করতে সাহায্য করে। এই অর্থে গীতার জ্ঞান নিজেই এক ধরনের চেতনাশুদ্ধির মাধ্যম।
কেশবার্জুনয়োঃ শব্দটির মধ্যেও একটি গভীর প্রতীকী অর্থ রয়েছে। এটি কেশব ও অর্জুনের সঙ্গে সম্পর্কিত দ্বিবচনীয় রূপ। কেশব এখানে শ্রীকৃষ্ণের নাম এবং অর্জুন মানব অনুসন্ধানী সত্তার প্রতীক। একজনের মধ্যে রয়েছে ঐশ্বরিক জ্ঞান এবং অন্যজনের মধ্যে রয়েছে মানবীয় প্রশ্ন। এই দুইয়ের মিলনেই গীতার সংলাপ সৃষ্টি হয়েছে। কেশব ও অর্জুন তাই কেবল মহাভারতের দুই চরিত্র নন। প্রতীকী দৃষ্টিতে তাঁরা ঈশ্বরীয় জ্ঞান এবং মানবীয় অনুসন্ধানের মিলনকে প্রকাশ করেন। মানুষ যখন জীবনের সংকটে পড়ে এবং সত্যের সন্ধানে প্রশ্ন করে, তখন তার অন্তরে যেন কৃষ্ণ ও অর্জুনের সেই সংলাপ আবার শুরু হয়।
এই শ্লোকের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো হৃষ্যামি। এর মূল ধাতু হৃষ্। এই ধাতুর মধ্যে আনন্দিত হওয়া, উৎফুল্ল হওয়া এবং আনন্দে রোমাঞ্চিত হওয়ার ভাব রয়েছে। তাই হৃষ্যামি শুধু আমি আনন্দিত হই অর্থ প্রকাশ করে না। এর মধ্যে এমন এক আনন্দের অনুভূতি রয়েছে যা অন্তরকে আন্দোলিত করে এবং কখনও শরীরেও রোমাঞ্চের সৃষ্টি করতে পারে। সঞ্জয় যে আনন্দের কথা বলছেন, তা কোনো সাধারণ হাসি বা সাময়িক সুখ নয়। এটি জ্ঞান ও পবিত্রতার স্মরণ থেকে উদ্ভূত গভীর অন্তরানন্দ। তিনি গীতার কথা স্মরণ করছেন এবং সেই স্মরণ তাঁর চেতনাকে আনন্দে পূর্ণ করছে।
এই আনন্দকে আরও তীব্র করেছে শ্লোকের শেষাংশ মুহুর্মুহুঃ। মুহুঃ অর্থ বারবার বা পুনঃপুনঃ। একই শব্দের পুনরুক্তি অর্থের তীব্রতা বাড়িয়েছে। সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য এবং মুহুর্মুহুঃ এই দুই পুনরুক্তি পরস্পরের সঙ্গে একটি সুন্দর সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে। প্রথম পুনরুক্তি স্মরণের পুনরাবৃত্তি বোঝায় এবং দ্বিতীয় পুনরুক্তি আনন্দের পুনরাবৃত্তি বোঝায়। অর্থাৎ সঞ্জয় যতবার স্মরণ করেন, ততবার আনন্দিত হন। এখানে একটি গভীর আধ্যাত্মিক সূত্র প্রকাশ পেয়েছে। সত্যিকারের জ্ঞান একবার উপলব্ধি করলেই তার কাজ শেষ হয় না। সেই জ্ঞানকে বারবার স্মরণ করতে হয়, চিন্তা করতে হয় এবং জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। তখন সেই জ্ঞান ধীরে ধীরে চেতনার স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠে।
বেদান্তের দৃষ্টিতে এই শ্লোককে শ্রবণ, মনন এবং স্মরণের ধারার সঙ্গে যুক্ত করা যায়। মানুষ প্রথমে সত্যের কথা শোনে। তারপর সেই কথার অর্থ নিয়ে চিন্তা করে। এরপর সেই সত্যকে বারবার স্মরণ করে এবং ধীরে ধীরে তা তার অন্তর্দৃষ্টির অংশ হয়ে ওঠে। সঞ্জয়ের সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য যেন সেই অন্তর্গত স্মরণের প্রতীক। তিনি গীতার বাণীকে কেবল কানে শোনেননি। তিনি তাকে নিজের চেতনার মধ্যে বহন করেছেন। ফলে সেই জ্ঞান অতীতের একটি ঘটনা হয়ে থাকেনি। স্মরণের মাধ্যমে তা তাঁর বর্তমান অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠেছে।
ভক্তির দৃষ্টিতেও এই শ্লোকের গুরুত্ব অসাধারণ। ভক্তির অন্যতম প্রধান অনুশীলন হলো স্মরণ। ঈশ্বরের নাম, রূপ, গুণ, লীলা এবং উপদেশ বারবার স্মরণ করার মাধ্যমে ভক্তের মন ঈশ্বরমুখী হয়। সঞ্জয়ের ক্ষেত্রে কৃষ্ণের বাণীর স্মরণও সেই ধরনের একটি অন্তর্গত সাধনার রূপ ধারণ করেছে। তিনি যতবার কৃষ্ণ ও অর্জুনের সংলাপ স্মরণ করেন, ততবার তাঁর হৃদয়ে আনন্দের উদয় হয়। এখানে স্মৃতি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়। এটি ঈশ্বরীয় সত্যের সঙ্গে বর্তমান মুহূর্তে পুনরায় সংযুক্ত হওয়ার একটি পথ।
যোগদর্শনের দিক থেকেও পুনঃপুনঃ স্মরণের গভীর অর্থ রয়েছে। মানুষের মন যে বিষয়কে বারবার চিন্তা করে, তার ছাপ চিত্তে গভীর হয়। তাই যে ব্যক্তি ক্রমাগত ভয় চিন্তা করে তার চেতনা ভয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়, আর যে ব্যক্তি জ্ঞান, সত্য, কল্যাণ এবং ঈশ্বরীয় ভাবনা স্মরণ করে তার চেতনা ধীরে ধীরে সেই দিকেই গড়ে ওঠে। এই কারণে সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য কেবল অতীত স্মরণ করার কথা নয়। এটি চেতনাকে সচেতনভাবে নির্মাণ করার একটি আধ্যাত্মিক পদ্ধতির ইঙ্গিত বহন করে।
ভগবদ্গীতা ১৮.৭৭ — শ্রীহরির বিশ্বরূপের স্মরণ, মহাবিস্ময় ও আধ্যাত্মিক আনন্দ
মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে শ্লোকটির তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। মানুষের স্মৃতি আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যে ঘটনা আমাদের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলে, সেটি মনে পড়লে সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত আবেগও আবার জেগে উঠতে পারে। সঞ্জয়ের ক্ষেত্রে গীতার সংলাপের স্মরণ তাঁর মধ্যে আনন্দ সৃষ্টি করছে। এর অর্থ হলো একটি মহৎ অভিজ্ঞতা স্মৃতির মাধ্যমে বারবার বর্তমান হয়ে উঠতে পারে। মানুষের জীবনেও এমন ঘটনা ঘটে। কোনো মহান শিক্ষকের একটি কথা, কোনো গভীর বইয়ের একটি বাক্য অথবা জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি বহু বছর পরও মনে পড়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে। তখন অতীতের সেই ঘটনা কেবল স্মৃতি থাকে না। তা বর্তমানের পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে।
সাহিত্যিক দৃষ্টিতে শ্লোকটির সৌন্দর্য প্রধানত তার শব্দের পুনরাবৃত্তি এবং আবেগের ক্রমবিকাশে। প্রথমে আছে রাজন্ সম্বোধন। তারপর আছে সংলাপ। সেই সংলাপ অদ্ভুত এবং পুণ্য। এরপর আসে পুনঃপুনঃ স্মরণ এবং শেষে পুনঃপুনঃ হর্ষ। অর্থাৎ শ্লোকটি যেন ধীরে ধীরে এক আবেগের চূড়ায় পৌঁছেছে। আশ্চর্য থেকে পবিত্রতা, পবিত্রতা থেকে স্মরণ, স্মরণ থেকে আনন্দ এবং আনন্দ থেকে পুনরায় স্মরণের এক চক্র এখানে সৃষ্টি হয়েছে। এই কারণেই শ্লোকটি সংক্ষিপ্ত হলেও তার আবেগ অত্যন্ত গভীর।
এই শ্লোকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ভালো জ্ঞানকে শুধু শোনা যথেষ্ট নয়। জীবনে এমন অনেক কথা আমরা শুনি যা মুহূর্তের জন্য ভালো লাগে কিন্তু পরে ভুলে যাই। আবার কিছু কথা আমাদের ভিতরকে পরিবর্তন করে দেয়। সেই কথাগুলো আমরা বারবার মনে করি। গীতার শিক্ষা সেই দ্বিতীয় ধরনের জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। সঞ্জয় যে আনন্দ অনুভব করছেন, তা প্রমাণ করে যে জ্ঞান যখন অন্তরের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা শুধু বুদ্ধির বিষয় থাকে না। তা আনন্দের উৎস হয়ে ওঠে।
একটি সহজ উপমা দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যায়। একটি সুগন্ধি ফুল হাতে না থাকলেও তার সুবাস অনেকক্ষণ মনে থাকে। ফুলটি চোখের সামনে নেই, কিন্তু তার সুবাস যেন আমাদের অনুভূতির মধ্যে উপস্থিত থাকে। একইভাবে কৃষ্ণ ও অর্জুনের সংলাপ সেই মুহূর্তে শেষ হয়ে গেলেও তার জ্ঞান সঞ্জয়ের অন্তরে জীবন্ত রয়েছে। তিনি যখন তাকে স্মরণ করেন, তখন সেই জ্ঞানের সুবাস আবার তাঁর চেতনার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাই তিনি বারবার হর্ষ অনুভব করেন।
এই শ্লোক আমাদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়। স্মরণ কেবল অতীতকে ধরে রাখার মাধ্যম নয়। সঠিক স্মরণ অতীতকে বর্তমানের মধ্যে পুনর্জীবিত করতে পারে। মানুষ যদি নিজের জীবনের মহৎ শিক্ষা, সত্য উপলব্ধি এবং কল্যাণকর অভিজ্ঞতাগুলো বারবার স্মরণ করে, তাহলে তার বর্তমান জীবনও সেই জ্ঞানের আলোয় পরিচালিত হতে পারে। বিপরীতে মানুষ যদি কেবল ভয়, ব্যর্থতা ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে বারবার স্মরণ করে, তাহলে তার চেতনাও সেই স্মৃতির দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। তাই কী স্মরণ করব এবং কীভাবে স্মরণ করব, সেটিও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধনা।
সঞ্জয়ের অবস্থান এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যুদ্ধের প্রধান যোদ্ধা নন। তিনি একজন সাক্ষী। কিন্তু সাক্ষী হওয়া মানেই নিষ্ক্রিয় থাকা নয়। একজন সত্যিকারের সাক্ষী কোনো ঘটনাকে গভীরভাবে গ্রহণ করতে পারেন এবং তার অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করতে পারেন। সঞ্জয় সেই অর্থে গীতার এক মহান সাক্ষী। তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও কৃষ্ণ ও অর্জুনের জ্ঞানসংলাপ উপলব্ধি করেছেন এবং পরে তার স্মরণে আনন্দিত হয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে জীবনের কঠিনতম পরিস্থিতির মধ্যেও জ্ঞানের আলো উদ্ভাসিত হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, গীতা অষ্টাদশ অধ্যায়ের এই শ্লোক মূলত স্মৃতির মাধ্যমে জ্ঞানের পুনর্জন্মের কথা বলে। সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য শব্দদ্বয় জানায় যে সত্যকে বারবার স্মরণ করতে হয়। সংবাদ শব্দটি জানায় যে সত্যের অনুসন্ধান প্রশ্ন ও উত্তরের মধ্য দিয়ে গভীর হতে পারে। অদ্ভুত শব্দটি জানায় যে সত্য উপলব্ধি বিস্ময় সৃষ্টি করে। পুণ্য শব্দটি জানায় যে সত্য চেতনাকে পবিত্র ও কল্যাণমুখী করতে পারে। হৃষ্যামি জানায় যে সেই সত্য অন্তরে আনন্দ সৃষ্টি করে এবং মুহুর্মুহুঃ জানায় যে সেই আনন্দ একবারের নয়, বারবার ফিরে আসতে পারে।
এইভাবে শ্লোকটির গভীরতম অর্থ দাঁড়ায় যে মহৎ জ্ঞান কেবল একবার শোনার বিষয় নয়। তাকে স্মরণ করতে হয়, ভাবতে হয় এবং অন্তরে ধারণ করতে হয়। যখন কোনো সত্য আমাদের চেতনার গভীরে প্রবেশ করে, তখন তার স্মরণ নিজেই এক ধরনের সাধনা হয়ে ওঠে। সঞ্জয়ের আনন্দ তাই কেবল একটি ব্যক্তিগত আবেগ নয়। এটি জ্ঞানকে স্মরণ করার আনন্দ, ঈশ্বরীয় সত্যের সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হওয়ার আনন্দ এবং মানুষের অন্তরে জ্ঞানের আলো জেগে থাকার আনন্দ। কৃষ্ণ ও অর্জুনের সেই পবিত্র সংলাপ তাই কুরুক্ষেত্রের একটি অতীত ঘটনা হয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। স্মরণের মাধ্যমে তা প্রতিটি যুগের মানুষের বর্তমান জীবনে নতুন করে কথা বলে। আর সেই কারণেই সঞ্জয়ের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় এক গভীর সত্যের বাণী, সত্যকে যত গভীরভাবে স্মরণ করা যায়, তার আলো ততবার অন্তরে ফিরে আসে এবং সেই আলো থেকেই জন্ম নেয় পুনঃপুনঃ আনন্দ।
ভগবদ্গীতা ১৮.৭৭ — শ্রীহরির বিশ্বরূপের স্মরণ, মহাবিস্ময় ও আধ্যাত্মিক আনন্দ
বাজারে সেরা কোন প্রযুক্তিগত সমাধানের মাধ্যমে আপনার ব্যবসা অনলাইন করুন।
30 দিনের মানি-ব্যাক গ্যারান্টি
আপনার কম অনলাইন বিক্রয় হার বিদায় বলুন!